দেশ

বৃক্ষবৈচিত্র্যে ভরপুর ভাওয়াল উদ্যান, বিকশিত হয়নি পর্যটন কেন্দ্রে

সদরুল আইন, গাজীপুর ১৩ অক্টোবর, ২০২১, ১৫:১১:২৪

  • ছবি : ইন্টারনেট।

গাজীপুর: বৃক্ষের সাথে মানবজাতির নিবিড় সুসম্পর্ক চিরদিনের। কর্মজীবনের সীমাহীন ক্লান্তি আর যান্ত্রিক কোলাহল ছেড়ে একটু অবকাশ ও নিরিবিলিতে হারিয়ে যেতে মানুষ ছুটে যায় বৃক্ষের কাছে। যান্ত্রিক শহরে সভ্য মানুষের কোলাহল ছেড়ে জীবন বিষিয়ে উঠলে মেকি সভ্যতার নিয়ন বাতি ছেড়ে  সভ্যতা ও কলকব্জাকে পিছনে রেখে মানুষ ছুটে যায় প্রকৃতির নীবিড় ছায়ায়।

যখন দিনে দিনে হারাতে থাকে মনের সৌন্দর্য, অনুভূতির দরজাগুলো যখন বিষিয়ে উঠে,জীবন ও মন যখন বৈচিত্র্য হারায় তখন একটু শান্তির পরশ খোঁজে অতৃপ্ত বিরহী মন। ঢাকার কর্মব্যস্ত মানুষ বেছে নেয় রাজধানীর সন্নিকটের  গাজীপুরের ভাওয়াল বনভূমিকেই।

রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার উত্তরে গাজীপুর জেলার গাজীপুর সদর ও শ্রীপুর উপজেলায় এই অপরূপ বৃক্ষরাজ্যের অবস্থান। লাল মাটির উর্বর ভূমিতে সেই সহস্র বছর আগেই এখানে গড়ে উঠেছিল বৃক্ষের আখড়া, হয়তো তখনো উদিত হয়নি ধূলিমাখা শহরে সভ্যতার সূর্য।

ভাওয়ালের বনভূমির প্রধান বৃক্ষ গজারি, এ কারণে একে ভাওয়ালের গজারির গড়ও বলা হয়। দেশে যে কয়টি বৃহৎ প্রাকৃতিক বনভূমি রয়েছে তার মধ্যে মধুপুর ও ভাওয়ালের গড় অন্যতম।

ঐতিহ্য, সৌন্দর্যে ভাওয়াল গড়ের তুলনা হয় না। আকর্ষণীয় সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্রের কারণে ক্রমেই ভাওয়ালের গড় পরিণত হতে থাকে পর্যটকদের পছন্দ ও আকর্ষণের প্রধান কেন্দ্র বিন্দুতে। পর্যটকদের আগ্রহ আরো বাড়াতে এবং এর জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু প্রথম ভাওয়ালের গড়কে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা দেন।

উদ্যান ঘোষণার পর থেকে এর প্রতি সরকারের নজর অনেক বেড়ে যায়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন-(১৯৭৪) অনুযায়ী ৫ হাজার ২২ হেক্টর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই উদ্যান গড়ে তোলা হয়। এখানে পর্যটকদের জন্য বৃদ্ধি করা হয় যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা এবং নিরাপত্তা।

ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান মূলত ক্রান্তীয় পতনশীল পত্রযুক্ত বৃক্ষের বনভূমি। এ বনে শালগাছের আধিক্য রয়েছে। গজারি বনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শীতকালে এই বৃক্ষের পাতা ঝরে যায়, গ্রীষ্মকালে আবার নতুন পাতা গজায়।

সেই হিসেবে বর্ষার সময়ে পুরো বন থাকে ঘন সবুজের সমারোহে ভরা। প্রাণিবৈচিত্র্যের দিক দিয়ে এই উদ্যান অনন্য। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে একসময় বাঘ, কালো চিতা, চিতাবাঘ, মেঘাবাঘ, হাতি, ময়ূর, মায়া হরিণ ও সম্বর হরিণ দেখা যেত।

 সময়ের পথ পরিক্রমায় সেসব এখন বিলুপ্ত। তবে খেকশিয়াল, বাগডাস, বেজি, কাঠবিড়ালী, গুঁইসাপ আর কয়েক প্রজাতির সাপের দেখা মেলে এখনো। এ উদ্যানে গড়ে প্রায় ৬৪ প্রজাতির প্রাণী রয়েছে, যার মধ্যে ৬ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ১০ প্রজাতির উভচর ও ৩৯ প্রজাতির পাখি রয়েছে।

বন বিভাগ এই বনে অজগর, ময়ূর, হরিণ ও মেছোবাঘ ছেড়েছে। বনে হাঁটার সময় দেখা মিলবে স্ট্রুর্ক বিলড কিংফিশার বা মেঘ হু, মাছরাঙ্গা, খয়রা গেছো পেঁচা, কাঠ ময়ূর, বন মোরগ, মুরগি। দেখা মিলবে বানর ও মুখপোড়া হনুমানেরও।

এ বনে ২২১ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে যার মধ্যে ২৪ প্রজাতির লতা, ২৭ প্রজাতির তৃণ, তিন প্রজাতির পাম জাতীয় বৃক্ষ, ১০৫ প্রজাতির ঔষধি, ১৯ প্রজাতির গুল্ম, ৪৩ প্রজাতির বৃক্ষ। শাল এ উদ্যানের প্রধান বৃক্ষ।

সারা দেশের মানুষের আকর্ষণ গাজীপুর। সবুজের অপার সমারোহ শাল গজারীর পত্রশোভিত প্রকৃতির নান্দনিক রুপসী কন্যা গাজীপুর। এখানে গড়ে উঠেছে দেশের বৃহত্তম শিল্প কলকারখানা। গড়ে উঠেছে বহু রিসোর্ট। ঢাকাসহ সারা দেশের অগণীত মানুষ সময় কাটাতে কর্মের খোঁজে বেছে নেয় গাজীপুরকেই। কিন্তু পর্যটনশিল্পসহ বহুক্ষেত্রেই গাজীপুরের কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি এখনো। ঢাকা যেভাবে সুসজ্জিত, গাজীপুর সেই তুলনায় বহুগুণ পিছিয়ে।

অথচ দেশের অধিকাংশ নেতৃত্বই গাজীপুর নির্ভর। তাদের রয়েছে এই গাজীপুরের জায়গা-জমি। অবসর কাটাতে প্রতিদিন তারা গাজীপুরকেই বেছে নেয়।

দেশের রাজস্ব আয়ের সিংহভাগ আসে এই গাজীপুর থেকেই।প্রায় কোটি মানুষের আবাসভূমি গাজীপুরে বহু নিদর্শন,বহু ইতিহাসের জনক হলেও ঢাকা আর গাজীপুরের উন্নয়ন চিত্রে রয়েছে ব্যাপক ব্যবধান,যা সরকারের উদাসীনতা ও স্থানীয় নেতৃত্বের ব্যর্থতা বলেই মনে করে এখানকার সাধারণ মানুষ।

নিউজজি/ এসআই/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ