দেশ

ভাষাসৈনিক গাজীউল হকের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

নিউজজি ডেস্ক ১৭ জুন, ২০২১, ১২:১৮:১৮

  • ভাষাসৈনিক গাজীউল হকের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

ঢাকা: গাজীউল হক একজন ভাষাসৈনিক। পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে মিছিল করেন। স্লোগান দেন। এজন্য তাকে সরকারের রোষানলে পড়ে কারাবরণ করতে হয়েছে কয়েকবার। কিন্তু কারাবরণের ভয়ে তিনি ভীত হননি। কর্মজীবনে তিনি একজন আইনজীবী। সংস্কৃতি ক্ষেত্রে তিনি একজন লেখক, কবি, গীতিকার। রাষ্ট্রভাষা বাংলা মর্যাদা পাবার পরও উচ্চ আদালতে বাংলাভাষা চালু না হওয়ায় তিনি ভীষণ কষ্ট অনুভব করতেন। বিভিন্ন সময় তার কথা, লেখায় এই আক্ষেপ প্রকাশ পেয়েছে। উচ্চ আদালতে বাংলাভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য তার চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না।

গাজীউল হক ১৯২৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালী জেলার ছাগলনাইয়া থানার নিচিন্তা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মওলানা সিরাজুল হক ছিলেন কংগ্রেস ও খেলাফত আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। তিনি পীর সাহেব হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। রাজনৈতিক কারণে তাকে বিশের দশকে নোয়াখালী জেলা থেকে বহিষ্কার করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানে বোমাবর্ষণ শুরু হলে তার বাবা তাদের পরিবারের সকলকে নিয়ে বগুড়া চলে আসেন। মা নূরজাহান বেগম ছিলেন গৃহিনী। মা'র কাছে প্রথম তিনি ‘ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলন’ এবং ‘বিটিশ পণ্য বর্জন-এর গল্প শোনেন। তার দাদা মওলানা আবদুল বারী এবং নানা মওলানা সাকরুদ্দীন পীর সাহেব ছিলেন। পাঁচ ভাই, তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। বড় ভাই ফরিদউদ্দিন, ছোট তিন ভাইয়ের মধ্যে নিজাম-উল হক, গোলাম কিবরিয়া এবং কাজল। বোনেরা আফিয়া বেগম, ফিরোজা বেগম হীরা এবং আব্রু বেগম রানী। গাজীউল হক ২০০৯ সালের ১৭ জুন মৃত্যুবরণ করেন।

গাজীউল হকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যখন শুরু হয় তখন তিনি থাকতেন নোয়াখালী জেলার ছাগলনাইয়া থানার নিচিন্তা গ্রামে। বাড়ির সামনে একটি মক্তবে তার পড়াশোনা শুরু হয়। মক্তবে তার শিক্ষক ছিলেন জমিরউদ্দিন। শিক্ষাজীবনের প্রথম শিক্ষক সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, 'এলাকাজুড়ে তার শিক্ষক জমিরউদ্দিনের সুনাম ছিল। তিনি মিথ্যা কথা বলতেন না। আর আচরণের মধ্যে একটা অদ্ভুত বিষয় ছিল-তিনি কখনো তার ছাত্রদের তুমি বলতেন না। ছোট ছোট শিশুদের আপনি করে বলতেন।' এই মক্তব পরীক্ষায় তিনি দু’টাকার বৃত্তি পান। মক্তবের পড়াশোনা শেষ করে তিনি কাশিপুর স্কুলে ভর্তি হন। তৃতীয় শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল বের হলে তিনি দেখলেন প্রথম হয়েছে অন্য ছাত্র। কিন্তু তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তিনিই প্রথম হবেন। এ কারণে নিজের ভুল খুঁজে বের করার জন্য তিনি শিক্ষকদের কাছে পরীক্ষার খাতা দেখতে চাইলেন। অঙ্ক খাতা নিরীক্ষা করে ধরা পড়ল ভুলে শিক্ষক তাকে অঙ্কে নম্বর কম দিয়েছেন। তিনি অঙ্কে একশত নম্বরই পেয়েছেন। পরে সব বিষয়ের নম্বর যোগ করে দেখা গেল তিনি প্রথম হয়েছেন। এই স্কুল থেকে তিনি উচ্চ প্রাইমারি  বৃত্তি লাভ করেন।

এখান থেকে ১৯৪১ সালে গাজীউল হক বগুড়া জেলা স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। গাজীউল হক ছিলেন ক্লাসের একমাত্র মুসলিম ছাত্র। এর ওপরে আবার পীরের ছেলে। মুসলিম হলেও অল্পসময়ের মধ্যেই সহপাঠীদের সঙ্গে তার হূদ্যতা গড়ে ওঠে। মেধাবী হওয়ায় শিক্ষকদের কাছেও তিনি প্রিয় ছাত্র হয়ে ওঠেন। বিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পরই ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস উদ্যাপন করার জন্য ছাগলনাইয়ায় মিছিল বের হয়। গাজীউল হক এই মিছিলে অংশ নেন। মিছিল এগিয়ে ছাগলনাইয়া থানা কার্যালয়ের সামনে পৌঁছালে তিনি সেখানে ব্রিটিশ পতাকা উড়তে দেখেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ব্রিটিশ পতাকা ইউনিয়ন জেক নামিয়ে সেখানে পাকিস্তানি তিনকোনা পতাকা উড়িয়ে দেন। একাজে তাকে সহযোগিতা করেন তাঁর দুই সহপাঠী মুজিবুল হক এবং খলিলউল্লাহ। এই অপরাধে পুলিশ তাঁদের ধরে নিয়ে হাজতে চালান দেয়। মেধাবী শিক্ষার্থী হওয়ায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাঁদের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজত থেকে মুক্ত করে আনেন।

এই স্কুলে পড়ার সময়েই তিনি ইতিহাস শিক্ষক সুরেন স্যারের সান্নিধ্যে আসেন এবং ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব তার ভেতরে দানা বাঁধে। এতেই থেমে রইলেন না তিনি। সে সময়ে কয়েকজন ছাত্র মিলে ‘বিদ্রোহী’ নামে একটি হাতে লেখা ম্যাগাজিন বের করতেন। গাজীউল হক ওই পত্রিকায় একটি কবিতা লেখেন। কবিতাটি জেলা প্রশাসনের নজরে পড়ে। জেলা প্রশাসন দ্রুত বিদ্যালয় কতৃর্পক্ষকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। সহকারি প্রধান শিক্ষক আবেদ আলী জেলা প্রশাসনের এই নির্দেশকে মানতে পারলেন না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে এর  প্রতিবাদ করেন। প্রতি বছরই বিদ্যালয়ে বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। একবার তিনি এই সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বির্তক, আবৃত্তি এবং গানে অংশ নিয়ে পুরস্কার পান। আর চার লাইনের একটি ছড়া লিখে তিনি বেশি আলোচিত হন। ছড়াটি ছিল—আমি গাইব গান মুক্ত কণ্ঠে, জীবন দীপের আলো জ্বেলে, সুর ছড়াব, রং ছড়াব, পুড়ব আমি, আলো ছড়াব।

১৯৪৬ সালে বগুড়া জেলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। এরপরই তিনি বগুড়া আজিজুল হক কলেজে আইএ ভর্তি হন। কলেজে ভর্তি হয়েই তিনি অধ্যক্ষ ভাষা বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সংস্পর্শে আসেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বগুড়া কলেজের আর্থিক সাহায্যের জন্য বিভিন্ন ইছালে ছওয়াবে বক্তৃতা দিতেন। প্রায় প্রতিটি জলসায় তার সঙ্গী হতেন গাজীউল হক। এ থেকে যে অর্থ পাওয়া যেত তা সম্পূর্ণ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কলেজের উন্নয়ন তহবিলে দান করতেন। পাশাপাশি কলেজের কয়েকজন শিক্ষক ছাত্রদের সাংস্কৃতিক বিকাশ ও মননশীলতার অনুশীলনের জন্য ‘শিল্পায়ন’ নামে একটি পাঠচক্র গড়ে তোলেন। যে ক’জন শিক্ষক এটি গড়ে তোলার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক আবুল খায়ের, অধ্যাপক গোলাম রসুল ও অধ্যাপক পৃথ্বিশ দত্ত। এই পাঠচক্রে অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গে গাজীউল হক, কবি আতাউর রহমান, তছিকুল আলম খান, জালাল উদ্দিন আকবর প্রমুখ নিয়মিত পড়াশোনা করতেন। সপ্তাহে একদিন রোববার এই পাঠচক্রে আসর বসত। এই আসরে ছাত্ররা গল্প, কবিতা রচনাসহ আবৃত্তি করতেন।

১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অসামপ্রদায়িক যুব প্রতিষ্ঠান গণতান্ত্রিক যুবলীগের দু’দিনব্যাপী কর্মী সম্মেলনের আয়োজন করে। গাজীউল হক বগুড়ার পাঠচক্র ‘শিল্পায়নে’-র সদস্যদের সঙ্গে অংশ নেন। এই সম্মেলনে নেতৃত্ব দেন তাসাদ্দুক হোসেন, মোহাম্মদ তোয়াহা, শামসুল হক প্রমুখ। সম্মেলনে প্রস্তাব পাঠ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। যার অন্যতম প্রস্তাব ছিল ‘মাতৃভাষাই হবে শিক্ষার বাহন, অফিস আদালতের ভাষা হবে বাংলা।’ এভাবেই তিনি ভাষা আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে কাজ করেন। অন্যদিকে এসব কাজে জড়িয়ে পড়ায় পড়াশোনার প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি আইএ পরীক্ষার পনেরো দিন আগে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে পড়াশোনা শুরু করেন। পরীক্ষার ফল বেরুলে তাঁর প্রতিবেশীদের কয়েকজন জানালেন গাজীউল হক ফেল করেছে। তার বাবা ছেলের কৃতিত্ব সম্পর্কে জানতেন। তিনি তাদের কথা বিশ্বাস করলেন না। বরং ধমকে দিলেন এই বলে তার ছেলে এমন ফল করতেই পারে না। অবশেষে গাজীউল নিজে কলেজে গিয়ে জানলেন তিনি স্টার মার্কস নিয়ে পাশ করেছেন।

১৯৪৮ সালে তিনি বগুড়া কলেজ থেকে আইএ পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিষয়ে অর্নাসে ভর্তি হন। এরপরই সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র হন। লেখাপড়ার পাশাপাশি ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে কারাবরণ করেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন-বেতন কর্মচারিগণ ধর্মঘট আহবান করলে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে তিনিও এর সমর্থন করেন। এই ধর্মঘট আন্দোলনে কেন্দ্রীয়ভাবে কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ১৬ নং কক্ষ থেকে। এই কক্ষটি গাজীউল হকের নামে বরাদ্দ ছিল। এখানে আসতেন ছাত্রনেতা অলি আহাদ, আবদুল হামিদ চৌধুরী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আবদুর রহমান চৌধুরী, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখ। ৪৯-এর এই ধর্মঘট আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার জন্যই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

১৯৫১ সালে অর্নাস পাশ করে এমএ-তে ভর্তি হন। এবার তিনি ফজলুল হক হলের আবাসিক ছাত্র হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের উপস্থিত বক্তৃতা, আবৃত্তি, বির্তক প্রভৃতি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। গান গেয়েও গানের আসরকে মাতিয়ে তুলতেন। ১৯৫২ সালে তিনি এমএ পাশ করেন। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার এমএ ডিগ্রি কেড়ে নেয়। পরবর্তী কালে ছাত্রনেতা ইশতিয়াক (ব্যারিস্টার), মোহাম্মদ সুলতান, জিল্লুর রহমান (আওয়ামী লীগের নেতা) প্রমুখের প্রচণ্ড আন্দোলনের চাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার এমএ ডিগ্রি ফেরত দিতে বাধ্য হয়।

১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্রে ভর্তি হন। এ বছরের ১৪ এপ্রিল তাকে চার বছরের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে ছাত্র আন্দোলনের চাপে কারাগারে থাকতেই তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তবে বহিষ্কারাদেশের কারণে তিনি কারাগারে বসে আইন পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাননি। পরবর্তী কালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জেংকিন্স ও রেজিস্টার হাদী তালুকদারের আন্তরিক সহযোগিতায় ১৯৫৬ সালে তিনি একসঙ্গে ১১ পেপার আইন পরীক্ষা দেন। এরপরও তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে কৃতকার্য হন। এরপরই তার ছাত্রজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

গাজীউল হক ১৯৪১ সালে ছাগলনাইয়া স্কুল থেকেই রাজনীতি অঙ্গনে প্রবেশ করেন। এর পরের বছর পারিবারিক কারণে বগুড়ায় এসে বসবাস শুরু করেন। ফলে কয়েকদিনের মধ্যেই বগুড়ার রাজনীতিতে তার প্রবেশ ঘটে। বগুড়া আজিজুল হক কলেজে ভর্তি হবার সময় অধ্যক্ষ হিসেবে পান ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে। তার সংস্পর্শে এসে গাজীউল হক বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৪ সালে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্রলীগ বগুড়া জেলা শাখার যুগ্ম সম্পাদক নিযুক্ত হন। একই বছর কুষ্টিয়ার নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের কনফারেন্সে তিনি যোগ দেন। এখানেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তার প্রথম পরিচয় হয়।

১৯৪৬ সালে তিনি ধুবড়িতে অনুষ্ঠিত আসাম মুসলিম লীগ কনফারেন্সে যোগ দেন। এখানে তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ব্যক্তিত্ব, বাগ্মীতা এবং নেতৃত্বে আকৃষ্ট হন। এর ছয় মাস পর বাহাদুরাবাদ ঘাটে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের অপর একটি সম্মেলনে তিনি অংশ নিলে মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে তার ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার সূত্রপাত হয়। পাকিস্তান হওয়ার পর অধিকাংশ মুসলিম ছাত্র বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। গাজীউল হকও সেই রাজনীতিতে অংশ নেন। ১৯৪৭ সালে তিনি পূর্ব-পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুব লীগের ঈশ্বরদী কনফারেন্সে উত্তরবঙ্গ শাখার যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচন হন।

১৯৪৮ সালে পূর্ব-পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি হন। এ বছরই প্রথম বাংলা ভাষার দাবিতে প্রদেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তাকে বগুড়ার ছাত্রদের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণে নেতৃত্বদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। বগুড়াতে কবি আতাউর রহমানকে আহ্বায়ক করে একটি ‘বাংলা ভাষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটিতে শিক্ষক ও ছাত্র ছাত্রী প্রতিনিধি ছিলেন। বগুড়ায় দু’জন ছাত্রী রহিমা খাতুন ও সালেহা খাতুন এই কমিটিতে ছিলেন। ১১ মার্চ গাজীউল হক বগুড়া কলেজ থেকে ছাত্রদের মিছিল নিয়ে বগুড়া শহরের দিকে এগিয়ে যান। তখন ড. শহীদুল্লাহ রিকশায় চড়ে কলেজের দিকে আসছিলেন। গাজীউল হক ছাত্রদের নিয়ে তার রিকশা থামিয়ে তাকে মিছিলে নেতৃত্ব দিতে অনুরোধ করেন। ড. শহীদুল্লাহ ছাত্রদের এই অনুরোধে সম্মতি জানিয়ে রিকশা থেকে নেমে মিছিলে অংশ নেন। সঙ্গে সঙ্গে মিছিলে অংশগ্রহণকারী কর্মীরা তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান। তিনি গাজীউল হকের দিকে তাকিয়ে তার স্বভাবসুলভ ঢঙ্গে বলেন, ‘মানে কী যে অ্যাঁ, আমাকে কী করতে হবে?’ গাজীউল হক বললেন, ‘স্যার, আপনাকে মিছিলের নেতৃত্ব দিতে হবে এটা আমাদের দাবি।’ তিনি কিছুক্ষণ ভাবলেন এরপর একটু হেসে তার চিরপরিচিত সেই ব্যাগটি গাজীউল হকের হাতে দিয়ে বললেন, ‘মানে কী যে আঁওপীর সাহেব, তাহলে তুমি আমার বোঝাটা নাও আর আমি তোমার বোঝাটা নিয়ে নিলুম।’

বগুড়া জেলা স্কুল ময়দানে সেদিনের সভার সভাপতি ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। সভাপতি হিসেবে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির স্বপক্ষে দীর্ঘ সময়ব্যাপী যুক্তি ও তথ্যনির্ভর ভাষণ দেন। এই ভাষণ সেদিন জনসমাবেশকে বিমোহিত করে। প্রদেশব্যাপী বামপন্থী প্রগতিশীল আন্দোলন যখন দানা বেঁধে উঠেছিল, সেই সময়ে বগুড়া থেকে গাজীউল হক, আবু মো. মজাহারুল ইসলাম, আতাউর রহমান (বগুড়া), তাছিকুল আলম খান (সম্পাদক অগত্যা মাসিক), জামালউদ্দিন আকবর প্রমুখ ঢাকায় ডেমোক্রেটিক ইকুথ লীগ কনভেশনে যোগ দেন। তত্?কালীন প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমিন প্রকাশ্যে পাবলিক হলে ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ লীগের কনভেশন করতে বাধা দেওয়ায় অনুষ্ঠানটি ইয়ার মোহাম্মদ খানের বাসায় অনুষ্ঠিত হয়। এখানে ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ লীগ গঠিত হয়। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কয়েকজন প্রথম সারির নেতা মনি সিং, খোকা রায়, আবদুল কাদের চৌধুরী, আলতাফ হোসেন, রণেশ দাশ গুপ্ত প্রমুখের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান।

১৯৫৭ সালে আইনজ্ঞ সৈয়দ নওয়াব আলীর অধীনে বগুড়া বারে যোগদানের মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৬৩ সালের মার্চ মাসে পূর্ব-পাকিস্তান ঢাকা হাইকোর্টে আইন ব্যবসায়ের সনদ লাভ করেন। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে যোগদান করেন। সর্বোচ্চ আদালতে একজন আইনজীবী হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে আইন ব্যবসা পরিচালনা করেন।

১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়। আবদুল মতিনকে এই কমিটির আহ্বায়ক নিযুক্ত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটির উদ্যোগে ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস ঘোষণা করা হয়। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন ঢাকায় এসে পল্টনের জনসভায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ঘোষণা দেন ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রহলে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট ঘোষণা করা হয়। ঘোষণানুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। গাজীউল হকও সেই সভায় অংশ নেন। সভা শেষে ছাত্ররা মিছিল নিয়ে ফুলার রোড হয়ে পূর্ব-পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনের বাসভবনের সামনে (বর্তমান বাংলা একাডেমি ) বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

এদিনই ঢাকা মোক্তার বার লাইব্রেরিতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ গঠন করা হয়। এতে আওয়ামী মুসলিম লীগ, খেলাফতে রাব্বানী, তমদ্দুন মজলিস, পূর্ব-পাকিস্তান যুবলীগ, পূর্ব-পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রভৃতি দল থেকে দু’জন করে প্রতিনিধি এবং প্রতিটি হল থেকে দু’জন করে হল ইউনিয়নের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক এ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

২০ ফেব্রুয়ারি বেলা ৩টায় পূর্ব-পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। সরকার কর্তৃক ২১ ফেব্রুয়ারিতে সভা মিছিল বন্ধ করে ১৪৪ ধারা জারির ঘোষণায় ঢাকায় ছাত্র সমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সেদিন প্রতিটি ছাত্রাবাসে ১৪৪ ধারা জারিকে নিন্দা করে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। সন্ধ্যার পর ৯৪ নং নবাবপুর রোডে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের এক সভা আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। অধিকাংশ সদস্য ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিরুদ্ধে মত প্রদান করলে প্রস্তাবটি ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্তের ব্যবস্থা করা হয়। ১৫ জন সদস্যের মধ্যে মোহাম্মদ তোয়াহা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে বক্তব্য রাখলেও কোনো পক্ষকেই ভোট দানে বিরত থাকেন। ১৫ জন সদস্যের মধ্যে ৪ জন সদস্য ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ভোট দেন। তাঁরা হলেন—অলি আহাদ, আবদুল মতিন, ডা. গোলাম মওলা ও শামসুল আলম।

গাজীউল হকের লেখালেখির শুরুটা ছাত্রজীবনে। কারাগারে বসে তিনি অনেক কবিতা, গান রচনা করেন। কর্মজীবনে শত ব্যস্ততার মাঝেও তার লেখালেখি থামেনি। সময় সুযোগ পেলেই তিনি লিখতেন। তার চিন্তা চেতনাকে প্রকাশ করতেন লেখনীর মাধ্যমে। এই লেখাগুলো পরবর্তী কালে বই আকারে প্রকাশিত হয়। তার বইয়ের সংখ্যাও নেহাত কম নয়।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers