শিল্প-সংস্কৃতি

সংগীত সাধক গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের প্রয়াণ দিবস আজ

নিউজজি ডেস্ক ২০ আগস্ট , ২০২০, ১৫:২০:৫১

  • সংগীত সাধক গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের প্রয়াণ দিবস আজ

ঢাকা : উপমহাদেশের প্রখ্যাত গীতিকার ও সংগীত সাধক গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। বাংলাভাষার কবি ও গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। বাংলা সংগীত ভুবনে এক অসাধারণ স্রষ্টা ছিলেন তিনি। তাঁর অসংখ্য অমর সৃষ্টি আমাদের সংগীতকে করেছে সমৃদ্ধ। 
 
‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’, ‘এই রাত তোমার আমার’,‘ও নদীরে, একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে’,‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ সহ নানা অমর গানের স্রষ্টা গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ১৯২৪ (মতান্তরে ১৯২৫) সালের ৫ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন।
 
তাঁর পিতা গিরিজাপ্রসন্ন মজুমদার ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক, ছিলেন বিখ্যাত উদ্ভিদবিদ। শৈশবে কলকাতা চলে গিয়ে তিনি ফিরে এসেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। থিতু হয়েছিলেন পাবনা শহরের মজুমদার পাড়ায়। এ সময় সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনায় মনোযোগী হন। কিন্তু মনের গহীনে যিনি শিল্পীসত্তা বহন করে চলেছেন তিনি তো সুযোগ পেলে সেদিকেই মন দেবেন।
 
গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তার সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠেছিল পাবনার আরেক কৃতিমান সাহিত্যিক, গীতিকবি ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালের সঙ্গে। কিন্তু গানের ফুল ভালো করে ফোটার আগেই ১৯৫১ সালে তিনি পুনরায় কলকাতা চলে যান। ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখান থেকেই তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাস করেন। পরে আবার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেও তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। বরেণ্য গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার প্রায় দশ বছর ক্যানসারের সাথে যুদ্ধ করে ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। 
 
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে বাংলা ছায়াছবি ও আধুনিক গানের জগতকে যাঁরা মাতিয়ে রেখেছিলেন তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম একজন। বাংলা ছবির গানের স্বর্ণযুগ বলা হয় গত শতাব্দীর পাঁচ, ছয়ের দশককে। সেই গান এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে, দোলা দেয় হৃদয়ে। একদিকে, চলচ্চিত্রের গান, অন্যদিকে মাঠ-ময়দানে গণ আন্দোলনের গানও আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল গোটা বাংলায়।
 
সমকালে ছিলেন তিনি গীতিকার শ্রেষ্ঠ। তার গানের বাণী কখনো একঘেঁয়ে নয়। ভাব, ভাষা, শব্দ, ছন্দ ও রচনাশৈলী নিয়ে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গেছেন। একই ফর্মে বেশিদিন গান লেখেননি। এ ব্যাপারে ছিলেন সতর্ক, সচেতন। সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “আমি চেষ্টা করি এক এক সুরকার ও গায়কের জন্য এক এক রকম গান লিখতে। অনেক সময় সুরের স্বাধীনতা স্বীকার করে শব্দ বসাই।”
 
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের সহায়তার জন্য। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রী পরিষদের শপথ অনুষ্ঠানে বাজানো হয় তাঁরই লেখা সেই বিখ্যাত গানটি, ‘শোন একটি মজিবরের কণ্ঠ থেকে লক্ষ মজিবরের কণ্ঠে সুরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি, আকাশে বাতাসে ওঠে রণি; বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ...।’ তার লেখা এই গান একাত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে লক্ষ প্রাণে শিহরণ বইয়ে দিত।
 
অনুপ্রেরণা যোগাত মুক্তিযোদ্ধাসহ মুক্তিপাগল বাঙালির হৃদয়ে। দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে বাংলাদেশে এসেছিলেন। । স্বাধীন বাংলাদেশে পা রেখেই মনে পড়ল তাঁর জন্মস্থানের কথা। ছুটে গেলেন কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত পাবনা দেখতে।
 
শহীদ সাধন সংগীত মহাবিদ্যালয়ে দুই বাংলার প্রখ্যাত গীতিকবিকে দেওয়া হলো প্রাণঢালা সংবর্ধনা। সেদিন মঞ্চে ছিলেন তাঁরই সহপাঠী, পাবনার আরেক কৃতি সন্তান ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল এবং অধ্যক্ষ কবি আবদুল গনি।
 
উল্লেখ্য যে, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের ‘শোন একটি মজিবরের কণ্ঠ থেকে’ গানটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন- ‘মিলিয়ন মুজিবরস সিংগিং’। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’র কথা আমরা কে না জানি। এর গীতিনাট্য রূপ দেন এইচএমভিতে লোকগানের প্রশিক্ষক ও গায়ক দীনেন্দ্র চৌধুরী, আর সুর ঠিক রেখে ‘পদ্মানদীর মাঝি’র গীতিনাট্যটির ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার।
 
বিখ্যাত সব কালজয়ী গানের অমর স্রষ্টা গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের গান গুলো হলো-
 
আমার গানের স্বরলিপি
গানে মোর ইন্দ্রধনু
মাগো, ভাবনা কেন, আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে
বাঁশি শুনে আর কাজ নাই সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি
ও নদীরে একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে
এই সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যায় এ কী বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু
এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন
কেন দূরে থাকো শুধু আড়াল রাখো কে তুমি কে তুমি আমায় ডাকো
এই পথ যদি না শেষ হয়
আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে
কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই
শোন একটি মজিবরের কণ্ঠ থেকে লক্ষ মজিবরের কণ্ঠে সুরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি, আকাশে বাতাসে ওঠে রণি; বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ
প্রেম একবার এসেছিল নীরবে
এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো
কত দূরে আর
এমন দিন আসতে পারে।

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers