শিল্প-সংস্কৃতি

একজন নিবেদিত আবৃত্তিশিল্পী শিমুল মুস্তাফা

নিউজজি প্রতিবেদক ১৭ অক্টোবর , ২০২০, ১৮:৫২:১৯

  • একজন নিবেদিত আবৃত্তিশিল্পী শিমুল মুস্তাফা

ঢাকা : বিরল কণ্ঠের মাধুর্যতা তার কণ্ঠে প্রতীয়মান। কণ্ঠের সেই ধ্বনি-প্রতিধ্বনি স্ফূলিত হয় অনুভূতির শেষসীমা পর্যন্ত। বিমোহিত করে অন্তর আত্মাকে। তিনি নন্দিত আবৃত্তিশিল্পী শিমুল মুস্তাফা। তিনি শুধু একজন বাচিকশিল্পীই নন, সাথে সাথে নিবেদিত একজন দেশপ্রেমিক মানুষও।

আজ ১৭ অক্টোবর নন্দিত এই বাচিকশিল্পীর জন্মদিন। আজ থেকে ৫৫ বছর আগে শিমুল মুস্তাফার জন্ম রাজধানী ঢাকাতেই। তার বাবা প্রয়াত খান মোহম্মদ গোলাম মুস্তুাফা এবং মা আফরোজ মুস্তাফা। শিল্পমনা পারিবারিক আবহে বেড়ে উঠেছেন শিমুল মুস্তাফা। তার শৈশবও কেটেছে ইট-কাঠের এই যান্ত্রিক নগরীতে।

মা-বাবা দুজনেই ছিলেন চারুকলার মানুষ। তাদের সন্তান যে শিল্পের অঙ্গনেই নিজেকে উদ্ভাসিত করবেন সেটি তো অমূলক নয়। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ে পড়েছেন শিমুল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আবৃত্তি তার নেশা হয়ে যায়।

জন্মদিন নিয়ে স্মৃতিচারণায় শিমুল মুস্তাফা বললেন, আগে আমার জন্মদিনের আনন্দ ভাগাভাগি করতাম রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লার সঙ্গে। কারণ, রুদ্রর জন্মদিন ছিল ১৬ অক্টোবর আর আমার ১৭ অক্টোবর। তাই দেখা যেত, রাতে দুটো জন্মদিনের পার্টি হতো একসাথে। কাছের সব বন্ধুদের নিয়ে জমত জম্পেশ আড্ডা।

আশির দশকের শুরুতে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় কবিতা আবৃত্তি এবং থিয়েটার বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সে সময় থেকেই তার আবৃত্তিচর্চার শুরু। একজন আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে তখন থেকেই তিনি কবিতাকে আঁকড়ে ধরেন। পঙক্তির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুরে বেড়ান শিল্পের প্রতি অমোঘ তৃষ্ণায়। 

এরপর ধীরে ধীরে তিনি বেশ পরিচিত হয়ে ওঠেন। বর্তমানে তিনি এদেশের একজন জনপ্রিয় আবৃত্তিকার হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। আবৃত্তির মধ্য দিয়েই বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করেছেন, দাঁড়িয়েছেন অসহায় মানুষের পাশে, তৈরি করেছেন প্রতিবাদের ভাষা। আবৃত্তিতে তৈরি করেছেন নিজস্ব ঢঙও। 

এটাই তাকে নিয়ে গেছে অগণিত মানুষের কাছে। কবিতা ভালোবেসেই পড়েন শিমুল মুস্তাফা। যা পড়েন তা মনে-প্রাণে বিশ্বাসও করেন এই আবৃত্তিকার। তবে তার আদর্শের সাথে মেলে না, এমন কবিতা তিনি পড়েনই না। কিন্তু স্বাধীনতা, মূল্যবোধ আর দেশপ্রেমের কবিতায় তার দৃপ্ত উচ্চারণ অনুরণিত করে সর্বস্তরের শিল্পপ্রেমীদের।

পেশা নয়, নেশা থেকেই আবৃত্তি চর্চা করছেন শিমুল। শিল্প তার কাছে আরাধনা। আশির দশকের শুরু থেকেই তিনি জড়িয়ে পড়েন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে। কণ্ঠে দুর্বার আওয়াজ তোলেন। তার দুঃসাহসী কণ্ঠ আজও ভয়হীন। একজন দুরন্ত, দুর্নিবার এবং চির আপসহীন মানুষ তিনি। এরপর কেটেছে দীর্ঘ তিন দশক।

তার সেই নির্ভীক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর আজও মানুষকে অনুপ্রাণিত ও উদ্দীপ্ত করে। মঞ্চে শিমুল মুস্তাফা কখনো প্রেম বা দ্রোহ, কখনো  প্রকৃতি, আবার কখনো ইতিহাস আশ্রিত কাব্য পঙক্তিতে মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করেন শ্রোতাদের। আবৃত্তি যে এতোটা শক্তিশালী ও জনপ্রিয় একটি শিল্পমাধ্যম সেটি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যাদের অনন্য অবদান, তাদেরই একজন শিমুল মুস্তাফা। বর্তমান প্রজন্মকে সৃজনশীল ও প্রগতির আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করতে শিমুল মুস্তাফার দরাজ কণ্ঠসৃত উচ্চারণ দীপ্তশিখার মত।  

শিমুল মুস্তাফার ভাষায়, ‘আবৃত্তি কণ্ঠের শিল্প নয়, মস্তিষ্কের শিল্প। কণ্ঠ হচ্ছে একটি সাউন্ড বক্সের মতো। মস্তিষ্ক যদি পরিশীলিত না হয়, সাউন্ড বক্স নিজে নিজে আর কতটাইবা বাঁচতে পারে। আমার মস্তিষ্কে যে বোধ এবং দৃশ্যপট তৈরি হচ্ছে, সেটাই আমি কণ্ঠ  দিয়ে ছেড়ে দিচ্ছি।’

এ পর্যন্ত প্রায় ৪০টির মতো আবৃত্তি অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন তিনি। এ ছাড়া তিনি আবৃত্তি প্রশিক্ষক ও সংগঠক হিসেবে কাজ করছেন। শিল্পীজীবনে তিনি পেয়েছেন মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসা এবং বহু পুরস্কার-সম্মাননা। দেশের বাইরেও পেয়েছেন অনেক খ্যাতি। একজন দূরন্ত, দুর্নিবার এবং চির আপোষহীন মানুষ হয়েই আজন্ম শিল্পের পথ পাড়ি বদ্ধপরিকর শিমুল মুস্তাফা। তার এই পথচলা হোক আরও দীপ্তময়। 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

        









copyright © 2020 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers