শিল্প-সংস্কৃতি

কালজয়ী গানের স্রষ্টা গোবিন্দ হালদারের প্রয়াণ দিবস আজ

নিউজজি ডেস্ক ১৭ জানুয়ারি , ২০২১, ১২:২৬:৪০

  • ছবি : সংগ্রহ

ঢাকা : মর্মভেদী কথা ও সুর কখনো কখনো বারুদের তীব্রতাকেও হার মানায়। একাত্তরে আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে 'যার যা কিছু তাই নিয়ে' যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে ভুখানাঙ্গা বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল তেমনই কিছু গান। যুদ্ধ শুরুর পর যেসব গীতিকার তাঁদের কথা দিয়ে বাঙালির রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম গোবিন্দ হালদার। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে রক্তলাল সূর্যের আভায় উদ্বুদ্ধ করেছে তাঁর লেখা গান। কোটি কোটি বাঙালিকে বিপ্লবী চেতনার গান শুনিয়ে যাওয়া অমর সেই শিল্পী।

মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি', 'এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা', 'পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্তলাল রক্তলাল'- বাঙালির অস্থিমজ্জার সঙ্গে মিশে যাওয়া এসব কালজয়ী গানের স্রষ্টা গোবিন্দ হালদারের প্রয়াণ দিবস আজ। 

তিনি ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারী, শনিবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার মানিকতলার জিতেন্দ্রনাথ রায় হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘ রোগভোগের পর ৮৪ বছর বয়সে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি দেন।

১৯৩০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগাঁয় জন্ম হয়েছিল গোবিন্দ হালদারের। চাকরি সূত্রে প্রায় ৫০ বছর আগে সেখান থেকে কলকাতায় পাড়ি জমান। মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগে হাওড়ায় কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেছিলেন, পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠছে, সেখানেই মরতে পারলে ভালো হয়। কিন্তু শরীরের যা অবস্থা, তাতে হয়তো সেটা হবে না। একাত্তরের কথা মনে করিয়ে দিলে তিনি বলেছিলেন, যদি বয়স কম থাকত, তবে হয়তো বাংলাদেশের জন্য আরো গান লিখতেন তিনি। বাংলাদেশে জন্ম না হওয়া সত্ত্বেও কেন বাংলাদেশের জন্যই গান লিখেছিলেন- সেই প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, কেন জানি না বাংলাদেশকেই আমার আপন মনে হয়। আবার জন্ম নিলে বাংলাদেশেই জন্মাতে চাই। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার বরেণ্য এ গীতিকারকে 'মুক্তিযোদ্ধা মৈত্রী সম্মাননা' প্রদান করে।

যেভাবে সৃষ্টি হলো সেই সব অমর গান

১৯৭১ সালের মে মাসের শেষ নাগাদ কলকাতায় বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের স্টুডিও থেকে ফের আত্মপ্রকাশ করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। খবরের পাশাপাশি সেখান থেকে প্রচার হতো বিপ্লবী সব গান, যা শুনে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি নির্যাতিত, নিপীড়িত কোটি কোটি বাঙালি খুঁজে পেত অনুপ্রেরণা।

শুরুতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচার করা বেশির ভাগ গানই ছিল পুরনো দিনের রেকর্ড করা। সেগুলোর বেশির ভাগই লেখা হয়েছিল যুদ্ধের আগে। একপর্যায়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মকর্তারা শ্রোতাদের নতুন কিছু দেওয়ার তাগিদ বোধ করছিলেন। তাঁরা রেকর্ড করা পুরনো গান বাজানোর পাশাপাশি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে নতুন গানের তালাশে ছিলেন। এ সময় সেই কেন্দ্রের বার্তা সম্পাদক কামাল লোহানী কলকাতায় তাঁর বন্ধু কামাল আহমেদকে জানালেন, মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করতে পারে এমন সংগ্রামী কথার কিছু গান খুঁজছেন তিনি। এমন কোনো গীতিকার তাঁর সন্ধানে আছে কি না? কামাল আহমেদ তাঁকে জানালেন গোবিন্দ হালদারের কথা।

কামাল লোহানী দ্রুত তাঁর সঙ্গে গোবিন্দ হালদারের বসার ব্যবস্থা করতে বললেন। নির্ধারিত দিনে এসপ্লানেডের একটি ক্যাফেটেরিয়ায় গোবিন্দ হালদার হাজির হলেন, কাঁধের ঝোলার ভেতর থেকে বের করলেন দুটি খাতা। সাদা মলাটে সেগুলোর ওপর লেখা ছিল 'জয় বাংলার গান'। দুটি খাতায় গান ছিল ৩০টির মতো। কামাল লোহানী এত দিন ধরে যার তালাশে ছিলেন গোবিন্দ হালদার তা-ই যেন মেলে ধরলেন তাঁর চোখের সামনে।

গোবিন্দ হালদার তাঁর খাতা থেকে একের পর এক গানের স্বরলিপি আউড়ে যেতে থাকলেন। আবৃত্তি শেষে কামাল লোহানী খাতা দুটি চাইলেন। একটুখানি হেসে বিনা কথায় সেগুলো তাঁর হাতে তুলে দিলেন গোবিন্দ হালদার।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে সে সময় সমর দাস ছিলেন জ্যেষ্ঠ সুরকার। কামাল লোহানী খাতা দুটি তাঁর হাতে তুলে দেন। এরপর কেটে গেল কয়েক সপ্তাহ। ব্যস্ততার কারণে সেগুলো খুলে দেখার ফুরসত পাননি সমর দাস। একদিন কামাল লোহানী শিল্পী আপেল মাহমুদের কাছে খাতা দুটির বিষয়ে জানতে চাইলেন। সব শুনে আপেল মাহমুদ উৎসাহ দেখালেন। দেখে-শুনে আপেল মাহমুদ প্রথমে বেছে নিলেন 'মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি।' এ বিষয়ে ১৯৮৪ সালে পাক্ষিক সাময়িকী 'তারকালোক'-এ আপেল মাহমুদ লিখেছিলেন, 'আমি নিশ্চিত ছিলাম এটা ঐতিহাসিক গান হতে চলেছে।' ওই রাতেই বন্ধু আশরাফুল আলমের সঙ্গে বসলেন তিনি (আপেল মাহমুদ)। সঙ্গে ছিল হারমোনিয়াম ও টেপরেকর্ডার। একটার পর একটা সুর তুললেন তাঁরা, তবে মনে ধরল না কোনোটাই। পরের দিন ফের তাঁরা বসলেন, দীর্ঘক্ষণ ধরে চেষ্টা চলল। এভাবে অনেক সাধনার পর শেষ পর্যন্ত জন্ম নিল বাঙালির রক্তে আগুন ধরানো সেই কালজয়ী গান। জুনের প্রথম সপ্তাহে প্রচার হয়েছিল গানটি।

গোবিন্দ হালদারের প্রথম গানটির অভাবনীয় সাফল্যের পর সেই খাতা দুটিতে নজর বুলাতে দেরি করেননি সমর দাস। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হলো আরেক অমর সৃষ্টি- 'পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল, রক্ত লাল।'

বিজয়ের পর ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর গোবিন্দ হালদার ফের কলম হাতে নেন। এবার তিনি লেখেন- 'এক সাগর রক্তের বিনিময়ে'। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে যাঁরা অকাতরে প্রাণ দিয়ে গেছেন তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আপেল মাহমুদের অনুরোধে গানটি লিখেছিলেন তিনি। সময় নিয়েছিলেন মাত্র এক দিন। দুই দিনে সুরসহ পুরো অবয়ব তৈরি হয়ে যায় সেই গানের। তারপর ফিরতে থাকে মানুষের মুখে মুখে।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers