শিল্প-সংস্কৃতি
  >
গ্যালারি

এক বিপ্লবী জীবন-যোদ্ধা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী

ফারুক হোসেন শিহাব ৬ মার্চ , ২০১৯, ১৫:০০:১০

  • এক বিপ্লবী জীবন-যোদ্ধা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী

একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন ভাস্কর, একজন হার না মানা বিদগ্ধ নারী তিনি। এক মমতাময়ী জননী, বিপ্লবী প্রেরণার নাম। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার গর্ব, জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান। তিনি জীবনযুদ্ধে জয়ী আলোকিত মহীয়সী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। তাঁর এই সংগ্রাম কিন্তু একদিনে সার্থকতা পায়নি। 

তিনি পুড়ে পুড়ে খাটি হয়েছেন, বিদগ্ধ হয়েছেন হোঁচট খেতে খেতে। জন্মের পর থেকেই দেখেছেন বাবা-মায়ের কলহ। তাঁর পুরো জীবনটাই কেটেছে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে। তবুও তিনি দমে যাননি, এক অদম্য প্রাণশক্তি নিয়ে দুর্গম পথ ফেরিয়ে নিজেকে অগ্রসর করেছেন কীর্তিমানদের সারিতে।

১৯৪৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি খুলনায় নানার বাড়িতে ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণীর জন্ম। তাঁর বাবার নাম সৈয়দ মাহবুবুল হক এবং মায়ের নাম রওশন হাসিনা। বাবা-মায়ের ১১ সন্তানের মধ্যে প্রিয়ভাষিণী সবার বড়। তাঁর নানা অ্যাডভোকেট আব্দুল হাকিম কংগ্রেস করতেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের শাসনকালে তিনি স্পিকারও হয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে তাঁর নানা সুপ্রিম কোর্টে কাজ করার জন্য ঢাকা চলে আসেন। প্রিয়ভাষিণীও নানার পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় আসেন। 

তখন তাঁকে ভর্তি করা হয় টিকাটুলির নারী শিক্ষা মন্দিরে। পরবর্তীতে নানা মিন্টু রোডের বাসায় চলে এলে প্রিয়ভাষিণী ভর্তি হন সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলে। তখন শহীদ জাহানারা ইমাম ছিলেন ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। তিনি খুলনার পাইওনিয়ার গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি এবং খুলনা গার্লস স্কুল থেকে এইচএসসি ও ডিগ্রি পাস করেন।

বাবা ছিলেন সৈয়দ বংশের অহংকারী পুরুষ। প্রায়ই তিনি স্ত্রীকে মারধোর করতেন। নয় বছর বয়সে নানাবাড়ি ছেড়ে দাদার বাড়িতে উঠলেন ফেরদৌসী। ইংরেজ ঘরানায় তৈরি সেই বাড়িতেও তার কতশত স্মৃতি। ছোট ভাইবোনকে কোলে পিঠে মানুষ করতে হয়েছে ফেরদৌসীকে। ঘরের কাজে সাহায্যও করতেন মাকে। বয়স ষোল হতেই ভালোবেসে ঘর ছাড়েন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। কিন্তু পালিয়ে গিয়ে অথৈ জলে পড়তে হয় তাঁকে। 

ভালোবাসার মানুষটি শিক্ষিত বলেই জানতেন তিনি, যা ছিল স্রেফ মিথ্যাচার। কিন্তু প্রতারক স্বামীকে ছেড়ে যাননি তিনি। তাঁকে সুযোগ দিলেন। স্কুলে ভর্তি করালেন। নিজের হাতে তুলে নিলেন সংসারের সব দায়িত্ব। ছোটখাটো চাকরি আর তিন-চারটা টিউশন করে আধপেটা খেয়ে কেটেছে অনেক দিন। ততদিনে তিনি এক সন্তানের জননী। সারাদিন চাকরি আর সংসার সামলেও অলস স্বামীর মারধোর সহ্য করে গেছেন মুখ বুজে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। অবশেষে ১৯৭১ সালে দু’জনের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে।

তিন সন্তানকে নিয়ে যখন একটু ঠিকঠাক মতো জীবন শুরু করতে যাচ্ছিলেন তখনই দেশে যুদ্ধ শুরু হল। ১৯৭১ সালের সে যুদ্ধে পাকসেনাদের হাতে ধরা পড়লেন তিনি। এদেশের আরো লক্ষ লক্ষ নারীর সাথে তিনিও পাক হানাদার বাহিনীর অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন। পরবর্তী সাত মাস তাঁকে অসহনীয় যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নয় মাস শেষ হলেও তার সংগ্রাম শেষ হয়নি। যুদ্ধশেষে শুরু হলো তার জীবন যুদ্ধের লড়াই। 

বঙ্গবন্ধু নির্যাতিত নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ বলে সম্মান দিয়েছিলেন। কিন্তু যে জাতি নিজে জাতির পিতাকে খুন করতে পারে, তারা বীরাঙ্গনাকে সম্মান দেবে -এটি বোধহয় একটু বেশিই চাওয়া। রাস্তাঘাটে চলতে-ফিরতে লোকজন তাঁকে শুনিয়েই বলতো ‘বারাঙ্গনা’। এমনি কঠোরতর আঘাত পেয়েও দমে যেতেন না তিনি। পারিবারিক অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেওয়া হতো না তাঁকে। দাওয়াত দিলেও অস্পৃশ্যের মতো একঘরে করে রাখা হতো। ছোটবেলায় নানাবাড়িতে মামা-খালাদের সাথে একসাথে খেলাধুলা করে বড় হয়েছেন। অথচ, তারাই দূরে সরিয়ে দিল তাঁকে। এসব উপেক্ষা মাঝে মাঝে সহ্য হতো না। তারপরও ঘুরে দাঁড়াবার পথ থেকে ছিটকে পড়েননি।

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর জীবনের সাথে মিশে আছে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস, মিশে আছে বীরাঙ্গনাদের দুর্বিষহ জীবন কাহিনি। তিনি একাত্তরের ভয়াবহ ধর্ষণ সম্পর্কে একমাত্র জবানবন্দি-দানকারী। ট্রাইব্যুনালে রাজাকার ও তাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে অকপটে সাক্ষ্য দিয়েছেন। 

সাহসী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী তার সাক্ষাৎকারে (একাত্তরের দুঃসহ স্মৃতি, সম্পাদনা শাহরিয়ার কবির) জানান, ‘রাতে ফিদাইর (উচ্চ পদস্থ পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা) চিঠি নিয়ে ক্যাপ্টেন সুলতান, লে. কোরবান আর বেঙ্গল ট্রেডার্সও অবাঙালি মালিক ইউসুফ এরা আমাকে যশোরে নিয়ে যেতো। যাওয়ার পথে গাড়ির ভেতরে তারা আমাকে ধর্ষণ করেছে। নির্মম, নৃশংস নির্যাতনের পর এক পর্যায়ে আমার বোধশক্তি লোপ পায়। ২৮ ঘণ্টা চেতনাহীন ছিলাম।’

ওই সাক্ষাৎকারে নিজের উপর হওয়া অত্যাচারের বিবরণ দিতে গিয়ে জাতির এই ত্যাগী সন্তান বলেন, ‘পাকিস্তানী সৈন্যরা কতো তারিখে আমার বাসায় এসেছিল তা আমার মনে নেই কারণ আমি যখন ডায়রি লিখতে শুরু করেছিলাম কিন্তু সেটা আমাকে ফেরত দেওয়া হয় নি ফলে আমি মনে করতে পারছি না। তবে সম্ভবত এটা অক্টোবরের প্রথম দিকে হয়েছিল। ২৮ ঘণ্টা বন্দি ছিলাম ক্যাম্পে।’

তিনি আরো বলেন, ‘...তারা আমাকে এক ঘণ্টা ধরে গালাগালি করে, শারীরিক নির্যাতন করে গাড়িতে করে নিয়ে চলল। আসলে এগুলো বলতে ইচ্ছে করে না। আমি যখন নোয়া পাড়ার ওদিকে যাই তখন হোটেল আল-হেলাল ছিল। একটা কফি দোকান ছিল। আমাকে ওখানে নিয়ে গিয়ে বলল- কফি খাবে? তখন আমার ভেতরটা কলঙ্কিত তখন আমি নিজের সাথে নিজেই দেখা করতে ভয় পেতাম। অন্ধকারের সাথে দেখা করতেও ভয় পেতাম, আলোর সাথেও দেখা করতে ভয় পেতাম। সবসময় আমার মধ্যে সংকোচ কাজ করত। পেছনে দাঁড়ানো ছাড়া আর সামনে দাঁড়াতাম না। এমনই মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলাম।’

পরবর্তীতে এক মেজরের সহায়তায় সেই ক্যাম্প থেকে মুক্তি পান ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। কিন্তু সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে পরিবারের কাছে ফিরে আসাটা কি খুব সহজ ছিল না। জীবনের এতো ক্লেদ, এতো নিষ্ঠুরতার পরেও উঠে দাঁড়িয়েছেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। মানুষের কাছ থেকে এতো পাশবিক আচরণ পেয়েও আবারো ফিরেছেন মানুষের কাছেই। জীবনের শত নিষ্ঠুর নির্মমতাই পরবর্তীতে তাঁর জীবনের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠে।  

১৯৭২ সালে প্রিয়ভাষিণী দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। তাঁর দ্বিতীয় স্বামী আহসান উল্লাহ আহমেদ ছিলেন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা। তাঁর জীবন সংগ্রামে সবচেয়ে বড় সঙ্গী ছিলেন তিনি। তাঁদের ছয় সন্তান। তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। মাঝে কিছুদিন স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন। তিনি ইউএনডিপি, ইউএনআইসিইএফ, এফএও, কানাডিয়ান দূতাবাস প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। শেষ বয়সে এসে নানা শিল্পকর্ম সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করেন এবং তা অবিরামভাবে অব্যাহত রাখেন।

তিনি বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত ভাস্কর। তাঁর শিল্পকর্ম খুবই জনপ্রিয়। ঘর সাজানো এবং নিজেকে সাজানোর জন্য দামী জিনিসের পরিবর্তে সহজলভ্য জিনিস দিয়ে কিভাবে সাজানো যায়, সেই সন্ধান থেকেই তাঁর শিল্পচর্চার শুরু। নিম্ন আয়ের মানুষেরা কিভাবে অল্প খরচে সুন্দরভাবে ঘর সাজাতে পারে সে বিষয়গুলো তিনি দেখিয়েছেন। ঝরা পাতা, মরা ডাল, গাছের গুড়ি দিয়েই মূলত তিনি গৃহের নানা শিল্প কর্মে তৈরি করতেন। 

খুলনায় তাঁর জন্মস্থান নানা বাড়ির নাম ছিল 'ফেয়ারী কুইন' বা 'পরীর রাণী'। প্রিয়ভাষিণীর ব্যক্তি ও শিল্পী জীবনে এই নানা বাড়ির প্রভাব অপরিসীম। কেননা, নানা বাড়িতেই কেটেছে তার শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো। সেখানেই প্রকৃতির সাথে মিলে-মিশে একাত্ম হবার প্রথম সুযোগ ঘটে তার। খুব ছোটবেলা থেকেই অনেক বিখ্যাত মানুষের সান্নিধ্যে আসতে পেরেছিলেন তিনি।

দেশে-বিদেশে ভাস্কর হিসেবে নন্দিত হয়েছেন বারবার। তার শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে তার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। ক্ষয়ে যাওয়া কাঠ যেভাবে সুন্দর হয়ে ওঠে, তাঁর জীবনটাও যেন তেমনি। ২০১০ সালে তিনি প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মাননা পান। প্রতিবার পুরস্কার পাওয়ার মুহূর্তে শিশুর মত উচ্ছ্বসিত হতেন আনন্দে। শিল্পকলায় অসাধারণ অবদানের জন্য এ বছরই তাঁকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রদান করা হয়।

স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অবদানের জন্য ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা খেতাব প্রদান করে। এছাড়াও তিনি হিরো বাই দ্যা রিডার ডাইজেস্ট ম্যাগাজিন (ডিসেম্বর ২০০৪), চাদেরনাথ পদক, অনন্য শীর্ষ পদক, রৌপ্য জয়ন্তী পুরস্কার (ওয়াইডব্লিউসিএ), মানবাধিকার সংস্থা কর্তৃক মানবাধিকার পুরস্কার এবং সুলতান স্বর্ণপদক ২০১৮-তে ভূষিত হয়েছেন ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী।

দীর্ঘদিন ধরে নানান শারীরিক জটিলতায় ভোগার পর  ২০১৮সালের ৬ মার্চ রাজধানীর ল্যাব এইড হাসপাতালের সিসিইউতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। তাঁর মত জীবন সংগ্রামী মানুষ জাতীর জন্য এক অনন্য প্রেরণা হয়ে থাকব।

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers