শিল্প-সংস্কৃতি
  >
গ্যালারি

মননে ও শিল্প-প্রকাশে অপ্রতিরোধ্য শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ

ফারুক হোসেন শিহাব ১১ সেপ্টেম্বর , ২০১৯, ১৫:২৫:১০

  • মননে ও শিল্প-প্রকাশে অপ্রতিরোধ্য শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ

চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ। চিত্রকলায় তার পরিচয় সংগ্রামী মানুষের প্রতিকৃতিতে দুর্দমনীয় শক্তি ও অপ্রতিরোধ্য গতির ইঙ্গিতময় অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলা। বিদ্রোহীচেতনে তিনি তাঁর চিত্রকর্মে তুলে আনেন মানবতা, প্রকৃতি, নারী, গতিসহ ভালোলাগা নানা অনুসঙ্গ। একাত্তরের চেতনায় যিনি বুকে ধারণ করেন লাল-সবুজের বাংলাদেশ। 

চিত্রশিল্পী হিসেবে যে কজন বাঙালি কৃতী সন্তান বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ তাঁদের অন্যতম। বিশ্বব্যাপী তার পরিচয় আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন একজন বাঙালি চিত্রশিল্পী। তার সৃজনের অন্যতম প্রেরণা জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু। ‘বাংলাদেশ’ এবং ‘জয় বাংলা’ শব্দ দুটো না থাকলে তিনি আজও বেঁচে থাকতেন না বলে বিশ্বাস করেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। মহান মুক্তিযুদ্ধ এই শিল্পীর শিল্পীসত্তাকে শক্তি যুগিয়েছে। 

আধুনিক ঘরানার প্যারিস-প্রবাসী এই শিল্পীর খ্যাতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশ-বিদেশে তিনি প্রচুর প্রদর্শনীতে অংশ নেন এবং বহু তাৎপর্যপূর্ণ পুরস্কার-সম্মাননায় ভূষিত হন। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে মাস্টার পেইন্টার্স অব কনটেম্পোরারি আর্টসের পঞ্চাশজনের একজন হিসেবে বার্সেলোনায় অলিম্পিয়াড অব আর্টস পদক লাভ করেন। 

আজ ১১ সেপ্টেম্বর চিত্রকলার পথিকৃৎ এই শিল্পীর ৬০তম জন্মদিন। ১৯৫০ সালের এই দিনে তিনি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু তার পৈতৃক নিবাস নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার আলগী গ্রামে। শাহাবুদ্দিনের বাবা তায়েবউদ্দীন প্রধান ছিলেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর মায়ের নাম সাইফুন্নেছা আহমেদ। তাদের সংসারে শাহাবুদ্দিন ছিলেন জ্যেষ্ঠ সন্তান।  ব্যক্তিগত জীবনে আনা’কে বিয়ে করেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। স্ত্রী আনা ইসলাম, কথা সাহিত্য ও শিল্প সমালোচক। শাহাবুদ্দিন-আনার সংসার জীবনে আছে দুই মেয়ে চিত্র ও চর্যা। তারাও শিল্প চর্চায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন।

শিল্পী শাহাবুদ্দিন ১৯৬৮ সালে ফরিদউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস,এস,সি পাশ করেন৷ তিনি ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন আর্টসে পড়াশোনা করে বিএফএ ডিগ্রী অর্জন করেন। ঐ বছরই ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। পরবর্তীতে ফ্রান্স সরকার হতে চারুকলায় বৃত্তি লাভ করে ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইকোল দে বোজার্ট চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে অদ্যাবধি প্যারিসে কর্মরত আছেন। 

তাঁর চিত্রকলায় সংগ্রামী মানুষের প্রতিকৃতিতে দুর্দমনীয় শক্তি ও অপ্রতিরোধ্য গতির ইঙ্গিতময় অভিব্যক্তির জন্য সুপরিচিত। তিনি মনে করেন, মানুষের মুক্তিযুদ্ধ অদ্যাবধি চলমান, এবং রং ও তুলির দ্বৈত অস্ত্র সহযোগে তিনি এ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে চলেছেন। সত্তুরের দশকের প্রারম্ভে বাংলাদেশে বিমূর্ত চিত্রকলার যে দুর্বোধ্য পর্বের সূচনা হয়েছিল, তার সঙ্গে গাঁটছড়া না-বেঁধে তিনি নির্মাণ করেন স্বকীয় শৈলী যার ভিত্তিতে রয়েছে শারীরী প্রকাশভঙ্গী। 

তাঁর এই চিত্রশৈলী বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মকে গভীরভাবে প্রভাবান্বিত করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ। অতঃপর দেশ স্বাধীন করে পুনরায় সমর্পিত হলেন চিত্রকলার ভুবনে। আর সেই শিল্পের ভুবনে বাংলাদেশের অনন্য এক চিত্রশিল্পী হয়ে উঠলেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। স্বকীয় শৈলীতে উদ্ভাসিত এই শিল্পীর ক্যানভাস। 

রং আর রেখার খেলায় অনবদ্য হয়ে ধরা দেয় তাঁর চিত্রপটের স্বতন্ত্র আঙ্গিকের শরীরী প্রকাশভঙ্গি। রেখারচিত্রের গতিময়তার মাঝে খুঁজে নেন নিজের লড়াকু জীবনকে। স্বদেশের প্রতি দায়বদ্ধ এই শিল্পীর ক্যানভাসে বারবার উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্যপট ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি।

বিচিত্র অভিব্যক্তিতে ইতিহাসের মহানায়ককে এঁকে তিনি তার সন্দর্ভ রচনা করে চলেছেন। পিতার স্মৃতি, ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত অধ্যায়কে শিল্পী ক্যানভাসে তুলে আনেন রক্তাক্ত নিথর বঙ্গবন্ধুর দেহের উপস্থাপনের মাধ্যমে। ধবধবে সাদা ক্যানভাসের অধিকাংশ স্পেস শূন্য কিন্তু গতানুগতিক নয়। বাঙালির পিতৃত্বের শূন্যতার সাথে রক্তাক্ত একটি অধ্যায়কে শাহাবুদ্দিন আমাদের বার বার মনে করিয়ে দেন। 

মহান মুক্তিযুদ্ধে প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে নেতৃত্ব দেন সম্মুখ সমরে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যার হৃদয়ে তার তুলিতেই তো মূর্ত হবে আমার প্রতিবাদ, আমার দ্রোহ। শাহাবুদ্দিন ক্যানভাসে ছবি আঁকেন, ক্যানভাসে কবিতা লেখেন, ক্যানভাসে যুদ্ধ করেন, মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে চান। তিনি মনে করেন, মানুষের মুক্তিযুদ্ধ আজো চলমান। তাই রং ও তুলির দ্বৈত অস্ত্র ব্যবহারের মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত তার চিত্রকলায় উঠে আসে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ।

সহযোদ্ধা হিসেবে তাঁর সাথে ছিলেন- ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা এবং পপ সম্রাট ও গুরু আজম খান। শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচণ্ড গতি, শক্তি, জীবন বাজি রেখে সম্মুখ রণাঙ্গনে অগ্রসর হবার কারণে তিনি তার ছবিতে গতিকে প্রাধান্য দেন বেশী। 

একজন গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শাহাবুদ্দিন এখনও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তার ছবির মোটিফ, রঙ ও কম্পোজিশনে অতুলনীয়ভাবে উপস্থাপন করে চলেছেন। তার ছবির মুখ্য বিষয় হলো সমসাময়িক মানুষ ও সময়। তার ছবিতে আশাবাদী মনোভঙ্গির প্রকাশ পায়। 

শিল্পী শাহাবুদ্দিন সবসময় উদ্দীপনাময়। তার ব্রাশের সজীবতা এবং শক্তি এসব ফিগারে প্রাধান্য পায়। রেখার টান এবং স্থিতির জন্য তার স্কেচগুলো হয়ে ওঠে শক্তিশালী। বিশেষ করে তার চারকোণ স্কেচ খুবই দৃষ্টিনন্দন ও সজীব। তিনি অনবরত আঁকেন বঙ্গবন্ধু, মহাত্মা গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথকে। তিনি শুধু তাদের পোর্ট্রেট করেন না, তাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেন মানবীয় অনুভূতি, আবেগ এবং আত্মপ্রকাশ।

বড় ক্যানভাসের পর্দায় গতিশীল ও পেশীবহুল অতিমানবীয় পুরুষের ছবি আঁকতে ভীষণ পছন্দ করেন শাহাবুদ্দিন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে উপজীব্য করে রংয়ের তুলির সাহায্যে যথাযথ উপস্থাপনা, প্রতিস্থাপন ইত্যাদি বিষয়গুলো সার্থক ও সফলভাবেই সম্পন্ন করেছেন তিনি। এছাড়াও, শাহাবুদ্দিনের তুলিতে নারী চিত্রকর্মগুলোয় তাদের চিরায়ত কোমলতা, দ্যুতির স্পন্দন, স্নিগ্ধতা দেখা যায়। মিহি কাপড়ের মাধ্যমে নারীকে আবৃত করে শারীরিক সৌন্দর্যের দ্যুতি তুলে ধরেন তিনি যাতে রমণীর অলৌকিক ও অসীম শক্তি বিচ্ছুরিত হয়।

দেশ-বিদেশের অনেক গ্যালারীতে তাঁর একক ও যৌথভাবে চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হয়। তার মধ্যে একক প্রদর্শনী হিসেবে– ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্তদেরকে অর্থ সাহায্যের জন্য ঢাকায় চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে চিত্র প্রদর্শনী। হল্যান্ড, পোল্যান্ড, সেনেগাল, বেলজিয়াম এবং ভারত-সহ সুইজারল্যান্ডের লুসানে অবস্থিত অলিম্পিক মিউজিয়াম এবং ফ্রান্সের বোর্গ-এন ব্রেজ মিউজিয়ামেও বৈশ্বিকভাবে প্রদর্শন অন্যতম। যৌথ প্রদর্শনী হিসেবে –

সেঁজুতির প্রথম চিত্রকলা প্রদর্শনী ও ভাষা আন্দোলন উপলক্ষে চিত্র প্রদর্শনী, ঢাকা, বাংলাদেশ; প্যারিসে অধ্যয়নরত শিল্পীদের আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনী, প্যারিস, ফ্রান্স; প্যারিসে ইউনেস্কো আয়োজিত আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনী, প্যারিস, ফ্রান্স; বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকলা প্রদর্শনী, চীন; গ্যালারী কনট্রাস্টে চিত্র প্রদর্শনী ব্রাসেলস, বেলজিয়াম; “দি হারমোনী শো”, মুম্বাই, ভারত; ইতালি ও কিউবাতে চিত্র প্রদর্শনী;

“সিগার দ্য লা হাভানা আ হরিজন ২০০০” চিত্র প্রদর্শনী, প্যারিস, ফ্রান্স অন্যতম। এবং সর্বশেষ ১৯ মার্চ থেকে ১৮ এপ্রিল ২০১৮ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও ভারতের গ্যাঞ্জেস আর্ট গ্যালারির যৌথ আয়োজনে শিল্পকলার জাতীয় চিত্রশালা ভবনের ২ নম্বর গ্যালারিতে মাসব্যাপী প্রদর্শনী। 

এ ছাড়াও শাহাবুদ্দিন আহমেদের বিভিন্ন চিত্রকর্ম বাংলাদেশ-সহ বুলগেরিয়া, তাইওয়ান, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রখ্যাত গ্যালারী, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত রয়েছে। ২০০০ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। এছাড়া চিত্রকর্মে অসামান্য অবদানের জন্য ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা নাইট উপাধিসহ দেশ-বিদেশে অসংখ্য পুরস্কার-সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ।

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers