শিল্প-সংস্কৃতি
  >
গ্যালারি

শিল্পের বিচিত্র নকশায় দীপ্তমান চিত্রশিল্পী আমিনুল ইসলাম

ফারুক হোসেন শিহাব ৭ নভেম্বর , ২০১৯, ১৪:১২:৩২

  • শিল্পের বিচিত্র নকশায় দীপ্তমান চিত্রশিল্পী আমিনুল ইসলাম

চিত্রশিল্পী আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশের প্রথমসারির প্রথিতযশা চিত্রশিল্পীদের মধ্যে অন্যতম। তার কাছে ছবি আঁকাটা জাদুর মত মনে হতো। তার কাজে সবসময়  রেখা এবং জ্যামিতিক আকার প্রাধান্য পায়। অন্যদিকে তিনি চান শিল্পের মধ্যে দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছাতে। তিনি বিমূর্ত চিত্রকলা দিয়ে মানুষের অন্তরে রেখাপাত করতে চেয়েছেন। 

কেননা, শিল্প দিয়ে তিনি গল্প বলতেন, না বলা কথাগুলো শৈল্পিক চিত্রায়নের মধ্য দিয়ে মানুষের ভেতরাত্মাকে স্পর্শ করার এক নিরন্তর প্রয়াস ছিল তার। তিনি ঢাকা আর্ট কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্র এবং প্রথম সরকারি গেজেটভুক্ত শিক্ষক। চিত্রকলায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৮১ সালে তাকে একুশে পদক এবং ১৯৮৮ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।

আজ ৭ নভেম্বর নন্দিত এই চিত্রকরের জন্মদিন। আমিনুল ইসলাম ১৯৩১ সালের এইদিনে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) নারায়ণগঞ্জের টেটিয়া গ্রামে তার মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস ছিল জ্বালা-কান্দিতে। আর বাবা ছিলেন একজন স্কুল পরিদর্শক। জন্মের সময় আমিনুলের বাবা ময়মনসিংহে কর্মরত থাকায় শৈশব শুরুর কয়েকটি বছর কাটে নানা বাড়িতেই।

এরপর বাবার বদলিসূত্রে কখনো ময়মনসিংহে, কখনো নারায়ণগঞ্জে, কখনো ঢাকায় আবার কখনো অন্যকোনো শহরের আলো-হাওয়ায় নিজেকে মেলাতে হয়েছে। সেইসব স্মৃতি ও দৃশ্যপট পরবর্তীতে তার হৃদয়-পটে শৈল্পিক বোধের জাগরণ তুলেছিল। আরব্য উপন্যাস, শাহনামার নানা গল্প, বাংলার চাঁদ সওদাগর, বেহুলার সুন্দরী, গাজির কিচ্ছাসহ নানা গল্প-কাহিনি তখন ছোট্ট আমিনুলের মনের রাজ্যে দারুণ অনুভূতি সৃষ্টি করতো। 

চাষাড়ার রামকানাই চন্দ্রের পাঠশালায় আমিনুল ইসলামের প্রথম পড়াশোনায় হাতেখড়ি। পড়াশোনার প্রতি অতোটা ঝোঁক না থাকলেও আমিনুলের অধিক ঝোঁক ছিল গল্প শোনার। স্কুলের ছুটিতে নানাবাড়ি ও দাদা বাড়িতে কাটানো সময় ও স্মৃতি তার শিল্পের গোড়াপত্তন ঘটিয়েছে। 

বিশেষ করে দাদা বাড়িতে শীত মৌসুমে মা-চাচিরা হরেক রকমের নকশী পিঠা বানাতেন। তখন সবার নিষেধ অমান্য করে আমিনুলও মা-চাচি ও বোনদের সাথে পিঠা নকশায় যোগ দিতো। বাঁশের পাতলা চটি কিংবা খেজুরকাঁটা দিয়ে পিঠায় বিচিত্র সেসব কারুকার্য শিশু আমিনুলকে শিল্পের পথে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে। মূলত, শৈশব-কৈশোরে দেখা গ্রামীণ সমাজের রূপকথা, নকশী পিঠা ও সূচীকর্ম জন্ম দেয় শিল্পী হওয়ার সুপ্ত বাসনা।

পরে শিক্ষাজীবন শুরু হয় ঢাকার আরমানিটোলার মাহুতটুলী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে দুবছর পড়ার পর ১৯৩৯ সালে তাকে আরমানিটোলা স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়। সেখানে পড়াকালীন একদিন অঙ্কন-ক্লাসে শিক্ষক শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী- আমিনুলের আঁকা দেখে প্রশংসা করেন। 

পরবর্তীতে সেই আনন্দই তাকে শিল্পের পথে আসতে তাড়িত করেছে। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময় বাবু বাজার মোড় থেকে ইসলামপুর যাওয়ার মুখে একটি ছবি বাঁধাইয়ের দোকান ছিল। আমিনুল প্রয়ই সেখানে যেতেন এবং ওস্তাদের আঁকা গ্লাস পেইন্টিং দেখে নিজেও আঁকার বাসনাকে বুকের ভেতর পুষতেন। 

এমনি একদিন ওস্তাদের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। আমিনুলও তার ভাবনার বিষয়ে ওস্তাদকে বুঝাতে সক্ষম হন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ওস্তাদের সান্নিধ্য লাভ করেন। ক্রমেই ছবি আঁকার প্রতি তার নেশাটা বাড়তে থাকে। এভাবেই অলঙ্করণ ও শিল্প নির্মাণের প্রতি তিনি নিবিষ্ট হতে থাকেন। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াকালীন স্কুলে ছবি আঁকার প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি তিনি শিল্পী হিসেবেও পরিচিতি পান। 

এসময়ে তিনি জাপানি, চীনা, ও ভারতীয় চিত্রশিল্পীদের কাজ অনুসরণ করতেন। তিনি জ্ঞানেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাজ পছন্দ করতেন। ছোটবেলা থেকেই কলকাতা আর্ট কলেজে পড়ার স্বপ্ন ছিল আমিনুলের। ফলে ১৯৪৭ সালে তিনি মেট্রিকুলেশন পাস করে চিত্রকলা বিষয়ে পড়াশুনার জন্য কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হতে যান। 

জুনের ৭ তারিখে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণও হন। কিন্তু পরীক্ষার পর আর্ট কলেজের শিক্ষক শিল্পী সফিউদ্দিন ও জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ তরে জানতে পারেন শিগগিরই দেশ ভাগ হয়ে যাচ্ছে, তাঁরাও দেশে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তখন তারা আমিনুলকে পরামর্শ দেন যে তার কলকাতায় ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন নেই কারণ ঢাকায়ই একটি আর্ট কলেজ হতে যাচ্ছে। 

এরপর তিনি জয়নুল আবেদীনের সাথে ঢাকায় ফিরে আসেন। ১৯৪৮ সালে নব্যপ্রতিষ্ঠিত গভর্নমেন্ট ইন্সটিটিউট অব আর্ট (বর্তমান চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) এ ভর্তি হন। ফলে তিনি ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম ব্যাচের ছাত্র। হামিদুর রহমান, ইমদাদ হোসেন, ইসমাইল, আবদুল কাদের তার সহপাঠী ছিলেন।

 ১৯৫৩ সালে তিনি প্রথম বিভাগে কৃতিত্বের সঙ্গেই স্নাতক সম্মান লাভ করেন এবং একই বছর ইতালি সরকারের বৃত্তি নিয়ে তিন বছরের জন্য ফ্লোরেন্সের আকাডেমি দেল বেল্লে আর্তে-এ উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে যান। সেখানে তার মননে বিনির্মাণ হয়েছে উচ্চতর শিল্প-সৌকর্য ও আভিজাত্যের গভীরতম বহমানতা।

আমিনুল ১৯৫৬ সালে ইতালি থেকে দেশে এসে ঢাকা আর্ট কলেজের শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি প্রথম সরকারি গেজেটভুক্ত শিক্ষক। ১৯৭৮ সালে তিনি আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালে নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই তিনি শিক্ষকতা থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন।

শিল্পি আমিনুল ইসলাম কোন বিশেষ রীতি অনুসরণ করে শিল্পচর্চা করেননি। তিনি জ্যামিতিক ফর্মকে তাঁর চিত্রে বেশি প্রাধান্য দিতেন। জ্যামিতিক ফর্ম তাঁর কাজে বিভিন্ন রূপে উপস্থাপিত হয়েছে। তাঁর প্রাথমিক পর্যায়ের কাজে জ্যামিতিক ফর্মের উপস্থিতি খুব সূক্ষভাবে থাকলেও ৫০-এর দশকের চিত্রগুলোতে এর উপস্থিতি টেক্সচারের সমন্বয়ে নতুন এক আঙ্গিকে ফুটে ওঠে। ফর্মগুলো একটির উপর অপরটি এমনভাবে বিন্যস্ত হয়েছে, যাতে প্রতিটি ফর্ম পরস্পরকে ছেদ করে। 

ফলে ছবিতে কিউবিক শিল্পরীতির জন্ম হয়। আবার ৬০-এর দশকে তাঁর চিত্রে ফর্মের চেয়ে বর্ণের প্রাধান্য বেশি দেখা যায়। চেনা ফর্মের জ্যামিতিকতার পরিবর্তে বিমূর্ত ধারার রূপই বেশি জোরালো হয়ে উঠেছে তাঁর এসময়ের কাজে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শিল্পি আমিনুলের চিত্রভাষা আবার পরিবর্তিত হয়। এ সময়ের চিত্রে তেলরং, ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো এবং হার্ডবোর্ডের সমন্বয়ে এক ধরনের কোলাজের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

ঢাকার বিভিন্ন স্থানে আমিনুল ইসলামের করা অনেকগুলো ম্যুরাল তথা শিল্পস্থাপনা রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- বাংলাদেশ ব্যাংকের পুরাতন ভবনের অভ্যন্তরের দেয়াল (১৯৬৮), ওসমানী হলের সামনের দেয়ালে নির্মিত মোজাইক ম্যুরাল (১৯৮৪), মতিঝিলে অবস্থিত জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের প্রবেশমুখে ২০ x ২০ ফুট আয়তনের ম্যুরাল (১৯৮৬) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বত্রিশ তলা ভবনের ললাটে উৎকীর্ণ ৮৪ x ১৫.১ ফুট আয়তনের ম্যুরাল (১৯৯৬)।

বর্ণাঢ্য শিল্পীজীবনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিসরূপ গুণী এই চিত্রশিল্পী একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পুরস্কার ছাড়াও পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার-সম্মাননা। তার মধ্যে ১৯৫২ ঢাকা আর্ট গ্রুপ শো-তে প্রথম পুরস্কার, ১৯৫৭-১৯৬৪ সালে জাতীয় শিল্প প্রদর্শনী, ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার এবং চিত্রকলায় অবদানের জন্য ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা অন্যতম।

আমিনুল ইসলাম ২০১১ সালের ৮ জুলাই বার্ধক্যজনিত কারণে ঢাকার গুলশান-২-এ তার নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জুমার নামাজের পর তার জানাজার শেষে তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers