শিল্প-সংস্কৃতি
  >
গ্যালারি

কাইয়ুম চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশের সংস্কৃতির বিদগ্ধ পথিকৃৎ

ফারুক হোসেন শিহাব ৩০ নভেম্বর , ২০১৯, ১৫:০৩:০০

  • কাইয়ুম চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশের সংস্কৃতির বিদগ্ধ পথিকৃৎ

তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সংস্কৃতির এক নিবেদিতপ্রাণ। তাঁর চিত্রকলা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে ধারণ করেছে বিপুল বৈভবে। তিনি শিল্পকে আলিঙ্গন করেছেন কর্মে-মর্মে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে। নিজেকে অধিষ্ঠিত হরেছেন শিল্পের একজন মহীরুহ হিসেবে। বলছি, বিদগ্ধ শিল্পী কাইউম চৌধুরীর কথা। পারিবারিকভাবে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা কাইয়ুম চৌধুরী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শিল্পের সঙ্গেই ছিলেন আলোকিত এই মানুষটি। 

আজ ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশের শিল্পকলা অঙ্গনের অনন্য এই নক্ষত্রের প্রয়াণদিবস। ২০১৪ সালে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের উৎসবে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বরেণ্য এই চিত্রশিল্পী। একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত কাইয়ুম চৌধুরীর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।

অত্যন্ত উঁচু স্তরের মানুষ আপাদমস্তক এই শিল্পসারথি। সবসময় তিনি অসাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করেছেন, জীবনে কখনো আপস করেনি। তিনি শুধু ছবি আঁকায় সীমাবদ্ধ থাকেননি। সাহিত্য-কবিতার জগতে তার কর্ম আছে। অনেকগুলো সুন্দর সুন্দর কবিতা লিখেছেন তিনি। ছোটদের জন্য লেখালেখি করেছেন। সামাজিক ও দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতেন।

১৯৩২ সালের ৯ মার্চ ফেনীতে জন্ম নেওয়া কাইয়ুম চৌধুরী ১৯৫৪ সালে ঢাকা আর্ট কলেজ থেকে ফাইন আর্টসে ডিগ্রি নেন। এরপর নিজের কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকায় মনোযোগী হয়েছিলেন তিনি। বইয়ের প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জার পাশাপাশি তেল ও জল রঙে আবহমান বাংলা ও বাংলার লোকজ উপাদানগুলোকে চিত্রে  আধুনিক ফর্মে ফুটিয়ে তোলার জন্য কাইয়ুম চৌধুরীর কৃতিত্বকে স্মরণ করেন তার অনুজরা।

জহির রায়হানের ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ আঁকার মধ্য দিয়ে এই শিল্পে তার পদচারণা শুরু। বিশ্লেষকরা বলেন, বইয়ের প্রচ্ছদের শিল্পমানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। কবি শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’র প্রচ্ছদশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীই। সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম দিককার গ্রন্থগুলোর প্রচ্ছদও তার তুলিতেই আঁকা হয়।

১৯৫৭ সালে আর্ট কলেজে শিক্ষকতায় যোগ দেন কাইয়ুম চৌধুরী। আর্ট কলেজে নিজের দুই বছরের কনিষ্ঠ তাহেরা খানমকে ১৯৬০ সালে বিয়ে করেন তিনি। ওই বছরই কাইয়ুম চৌধুরী আর্ট কলেজ ছেড়ে যোগ দেন কামরুল হাসানের নেতৃত্বে নবগঠিত ডিজাইন সেন্টারে। ১৯৬১ সালে ডিজাইন সেন্টার ছেড়ে অবজাভার হাউজে চিফ আর্টিস্ট হিসেবে যোগ দেন তিনি।

পরে ১৯৬৫ সালে আবার আর্ট কলেজে ফিরে যান কাইয়ুম চৌধুরী, চারুকলা ইনস্টিটিউট হওয়ার পর এর অধ্যাপক হিসেবে ১৯৯৪ সালে অবসর নেন তিনি। প্রায় দুই দশক আগে দৈনিক প্রথম আলো বের হলে এর সঙ্গে যুক্ত হন কাইয়ুম চৌধুরী। এরপর থেকে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন তিনি।

ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পাথেয় করে সম্ভবত কাইয়ুম চৌধুরীই সবচেয়ে বেশি ছবি এঁকেছেন। কখনো সরাসরি বক্তব্যকে প্রধান করে, কখনো বা প্রতীকী অবয়বে। এই ছবিগুলি দেশের চিত্রকলার ক্ষেত্রে বিশেষ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী দেশের বরেণ্য শিল্পীর আসনে অধিষ্ঠিত। 

দেশে বিদেশে পুরস্কৃত হয়েছেন কিন্তু কাইয়ুম চৌধুরী সব সময়ই মনে করতেন তাঁর শিল্পী জীবনের বড় প্রাপ্তি বাংলাদেশের মতো অপূর্ব সুন্দর দেশটিতে জন্মেছিলেন এবং দেশের মানুষের ভালোবাসা পেয়েছিলেন। চিত্র ও ব্যক্তিত্বে এমন অসাধারণ সুন্দর মানুষটি আমাদের প্রেরণার অন্যতম আশ্রয়। চিত্রকলার উদ্ভাবনময়তা, শিল্পসংগঠন শক্তি ও নান্দনিক ভাবনায় কাইয়ুম চৌধুরী পরিণত হয়েছিলেন সাংস্কৃতিক রুচির এক অনন্য নির্মাতায়। 

তাঁর শিল্পসত্তা ছিল বহুমাত্রিক; বিচিত্রমুখী। লোকজ উপাদানকে তিনি তাঁর চিত্রকলায় ফুটিয়ে তুলেছেন অপূর্ব চারুদক্ষতায়। সুদীর্ঘকাল ধরে কাইয়ুম চৌধুরীর রেখা ও রঙে বাংলার চিরায়ত প্রকৃতি ও মানুষ যে অনন্য রূপ-ব্যঞ্জনায় ভাস্বর হয়ে উঠেছে, তা কখনো বিস্মৃত হবার নয়। লোকশিল্পকলার বিষয় ও আঙ্গিক তাঁর চিত্রভুবনকে করেছে একই সঙ্গে জন্মলগ্ন ও রুচিস্নিগ্ধ। 

শিল্পকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৬ সালে একুশে পদক লাভের পর ২০১৪ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার পান তিনি। এছাড়াও শিল্প-সৃজনে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১০ সালে পেয়েছেন সুফিয়া কামাল পদক। একইভাবে তার পুরস্কারের তালিকায় রয়েছে শেলটেক  পুরস্কার, সুলতান পুরস্কারসহ বহু দেশি-বিদেশি পুরস্কার-সম্মাননা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নোট ডিজাইন এবং ম্যুরাল কমিটির সদস্য ছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। বাংলাদেশে প্রচলিত কয়েকটি টাকার নোটের ডিজাইন তারই করা।

২০১৪ সালে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের উৎসবে বক্তৃতা রাখতে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি তার নির্ধারিত বক্তৃতা দেওয়ার পর অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বক্তৃতা দিতে দাঁড়িয়েছিলেন। এ সময় ডায়াসে ফিরে কাইয়ুম চৌধুরী বলেন- ‘আমার একটি কথা বলার রয়েছে’। 

কিন্তু সে কথা বলার আগেই স্ট্রেজে লুটিয়ে পড়েন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে তাকে নেওয়া হয় কাছের ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)। সেখানে চিকিৎসকরা দেখে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের সব প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের আমৃত্যু শিল্পযোদ্ধা কাইয়ুম চৌধুরী বহুকাল বেঁচে থাকবেন বাংলার লাল-সবুজে।

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers