শিল্প-সংস্কৃতি
  >
সঙ্গীত

সুরের মায়ায় কালজয়ী হয়ে আছেন শচীন দেববর্মণ

ফারুক হোসেন শিহাব ৩১ অক্টোবর , ২০১৯, ১২:৫২:৪৬

  • সুরের মায়ায় কালজয়ী হয়ে আছেন শচীন দেববর্মণ

শুধু সঙ্গীতশিল্পী হিসেবেই নয়, গীতিকার হিসেবেও তিনি সার্থক। বহু চলচ্চিত্রে সাফল্যের সাথে সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। শতবর্ষ  পেরিয়েও বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে তাঁর কালোত্তীর্ণ গানের আবেদন বিন্দুমাত্র কমেনি। বলছি, বিংশ শতাব্দীতে ভারতীয় বাংলা গানের কিংবদন্তীতুল্য ও জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী শচীন দেববর্মণের কথা। ‘নিটোল পায়ে রিনিক ঝিনিক পায়েলখানি বাজে’ কিংবা ‘ঘাটে লাগাইয়া ডিঙ্গা’র মত অসংখ্য জনপ্রিয় গান তার অন্তরসৃত। 

উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুরকার তিনি। যে কী-না কাজী নজরুল ইসলামের জনপ্রিয় অনেক গানের সুরকার। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- পদ্মার ঢেউ রে। এছাড়াও শচীনের গাওয়া অথবা সুর করা গানের মধ্যে রয়েছে- ‘তুমি এসেছিলে পরশু’, ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই’, ‘কে যাস রে ভাটি গাঙ’, ‘নিশিথে যাইওরে ফুলবনে’, ‘শোনো গো দখিন হাওয়া’, ‘রঙিলা রঙিলা’, ‘ঝিলমিল ঝিলমিল’, ‘নিটল পায়ে’, ‘বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে’, ‘তুমি আর নেই সে তুমি’, ‘টাকডুম টাকডুম বাজে’, ‘আঁখি দুটি ঝরা’ ইত্যাদি।

বিংশ শতাব্দীতে ভারতীয় বাংলা ও হিন্দি গানের কিংবদন্তীতুল্য ও জনপ্রিয় সঙ্গীত পরিচালক, সুরকার, গায়ক ও লোকসঙ্গীত শিল্পীকে এস ডি বর্মণ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়। কিছুটা অনুনাসিক কণ্ঠস্বরের জন্য তিনি তাঁর শ্রোতাদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত। 

আজ ৩১ অক্টোবর কীর্তিমান এই সঙ্গীতজ্ঞের প্রয়াণদিন। প্যারালিটিক স্ট্রোক হয়ে পাঁচ মাস কোমায় থাকার পর ১৯৭৫ সালের এইদিনে তাঁর মৃত্যু হয়। ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর উপমহাদেশের আলোচিত এই সঙ্গীতশিল্পীর জন্ম কুমিল্লায়। ছোটবেলা থেকে সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগী ছিলেন শচীন। তিনি ত্রিপুরার চন্দ্রবংশীয় মানিক্য রাজপরিবারের সন্তান। বাবা নবদ্বীপচন্দ্র দেববর্মণের কাছে সঙ্গীত শিক্ষা শুরু করেন। তৎকালীন ত্রিপুরার অন্তর্গত কুমিল্লার রাজপরিবারের নয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। তাঁর মা মণিপুরি রাজবংশের মেয়ে নিরুপমা দেবী। 

১৯২০ খ্রিস্টাব্দে কুমিল্লা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে ঐ কলেজ থেকে আইএ এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ তে ভর্তি হন। ত্রিপুরার মহারাজারা কুমিল্লায় তৈরি করেন টাউনহল, নাট্যশালা, লাইব্রেরি এবং নানা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

১৯২০ খ্রিস্টাব্দের দিকে শচীন দেবের বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন সুরসাগর হিমাংশু দত্ত, অজয় ভট্টাচার্য, মোহিনী চৌধুরী, সমরেন্দ্র পাল, কাজী নজরুল ইসলাম, শৈলবালা দাম, ধ্রুপদীয়া সৌরেন দাশ, সুধীন দাশ প্রমুখ। সেখানে নিয়মিত আসতেন চলচ্চিত্র পরিচালক সুশীল মজুমদার, ননী মজুমদার, ব্রজেন ব্যানার্জি, জিতু দত্ত, অরুণ মহলানবিশ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। তাঁর গানের ধরন ছিল ভোরকীর্তন, নগরকীর্তন, কবিগান, ঢপযাত্রা। সাহিত্যিক, সুরকার, গীতিকার, কবি ও সঙ্গীতজ্ঞগণ ইয়ংমেন্স ক্লাবে একত্রিত হতেন। তাদের আড্ডা থেকে ভেসে আসত নজরুল ও শচীন দেবের গান।

নজরুল কুমিল্লা এলে থাকতেন তালপুকুরের পশ্চিমপাড়ের একটি ঘরে। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে শচীন দেব কুমিল্লা থেকে কলকাতা চলে যান। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে তিনি প্রথম গান করেন। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে পিতা নবদ্বীপচন্দ্র কলকাতায় দেহত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি ছিলেন ত্রিপুরার প্রধানমন্ত্রী। শচীন দেব তখন থাকতেন কলকাতার ত্রিপুরা প্যালেসে।

১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে তার প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড বের হয় হিন্দুস্তান মিউজিক্যাল প্রোডাক্টস থেকে শচীন দেবের প্রথম রেকর্ডকৃত দুটি গান হল পল্লীগীতির ঢঙে গাওয়া "ডাকিলে কোকিল রোজ বিহানে" যার গীতিকার হেমেন্দ্র কুমার রায় এবং খাম্বাজ ঠুমরি অঙ্গের রাগপ্রধান ‘এ পথে আজ এসো প্রিয়’ যার গীতিকার শৈলেন রায়। 

১৯৩০-এর দশকে তিনি রেডিওতে পল্লীগীতি গেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পূর্ব বাংলা এবং উত্তর-পূর্ব বাংলার পল্লীগীতির উপর তাঁর বিশেষ ঝোঁক ছিল। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে অল ইন্ডিয়ান মিউজিক কনফারেন্সে তিনি গান গেয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্সে ঠুমরি পেশ করে ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁকে মুগ্ধ করেছিলেন। শেখ ভানুর রচনা ‘নিশিথে যাইয়ো ফুলবনে’ দেহ ও সাধনতত্ত্বের গানটিকে প্রেমের গানে রূপান্তর করলেন কবি জসীমউদ্দীনকে দিয়ে এবং রূপান্তরিত এই গানটি রেকর্ড করলেন ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে। 

তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- শোন গো দখিন হাওয়া, বিরহ বড় ভাল লাগে, সুবল রে বল বল, বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে, কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া এবং ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে লেখা তাকদুম তাকদুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে রাজগী নামক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গীত পরিচালনা জীবনের শুরু।  তাঁর সঙ্গীত পরিচালনায় বহু গান জনপ্রিয়তা পেয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- যদি দখিনা পবন (রাগপ্রধান), প্রেমের সমাধি তীরে (কাব্যগীতি), নিশীথে যাইও ফুলবনে (পল্লিগীতি), বধুঁগো এই মধুমাস (পল্লিগীতি) এবং ওরে সুজন নাইয়া (পল্লিগীতি)। 

শুধু বাংলা গানই নয়, জনপ্রিয় বহু হিন্দি গানও সৃষ্টি হয়েছে তার হাতে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- হ্যায় আপনা দিল তো আওয়ারা, যায়ে তো যায়ে কাহা সমঝেগা কওন ইয়াহা, এক লাড়কি ভিগিভাগিসি, হাল ক্যায়সা হ্যায় জনাবকা, বাবু সমঝো ইশারে,   ছোড় দো আঁচল, চান্দ ফির নিকলা,  জীবনকে সফরমে রাহে মিলতে হ্যায় বিছাড়যানেকো এবং লতা মুঙ্গেশকর ও কিশোর কুমারের অসংখ্য সুপারহিট গান এসেছে শচীন দেব বর্মণের কাছ থেকেই। 

ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৩৭ সালে সঙ্গীত জীবনের বিশ্বস্ত সঙ্গী মীরা ধরকে তিনি বিয়ে করেন। পরবর্তীতে সহধর্মিনী মীরা দেববর্মণ গীতিকার হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁদের পুত্র রাহুল দেববর্মণও ভারতের বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক এবং সুরকার ছিলেন। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে শচীন দেববর্মণ স্থায়ীভাবে মুম্বাইয়ে বসবাস করতে শুরু করেন।

বর্ণাঢ্য সঙ্গীতজীবনে ১৯৩৪ সালে বেঙ্গল সর্বভারতীয় সঙ্গীত সম্মেলনে  স্বর্ণপদক,১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতের সঙ্গীতে নাটক একাডেমি এবং এশিয়ান ফিল্ম সোসাইটি লন্ডন থেকে সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারত সরকার হতে পদ্মশ্রী খেতাব লাভ করেন। এছাড়া ১৯৫৯ সালে এশিয়া ফিল্ম সোসাইটি অ্যাওয়ার্ড,১৯৬৪ সালে সেন্ট হরিদাস অ্যাওয়ার্ড, ১৯৭০ ও ১৯৭৪ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ১৯৬৯ সালে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রী খেতাব লাভ। 

পাশাপাশি ১৯৫৪, ১৯৭৩, ১৯৫৯, ১৯৬৫, ১৯৬৯, ১৯৭০ এবং ১৯৭৪ সালে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক এর জন্য ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন এবং ১৯৬৫, ১৯৬৬, ১৯৬৬, ১৯৬৯ ও ১৯৭৩ সালে শ্রেষ্ঠ সুরকার হিসেবে বিএফজেএ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন।

প্যারালিটিক স্ট্রোক হয়ে পাঁচ মাস কোমায় থাকার পর ১৯৭৫ সালে ৩১ অক্টোবর তাঁর প্রয়াণ ঘটে। যেমনিভাবে অসাধারণ কিছু গানের জন্য কালজয়ী হয়ে আছে তার কণ্ঠস্বর। ঠিক তেমনি সুরের মায়াজালে উপমহাদেশের সঙ্গীতপ্রেমীদের জাগিয়ে রাখবেন সঙ্গীতের এই পথিকৃৎ।

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers