শিল্প-সংস্কৃতি
  >
সঙ্গীত

আঞ্চলিক গানের পথিকৃৎ শিল্পী শেফালী ঘোষ

ফারুক হোসেন শিহাব ৩১ ডিসেম্বর , ২০১৯, ১৩:৩৬:৩৫

  • আঞ্চলিক গানের পথিকৃৎ শিল্পী শেফালী ঘোষ

তার মায়াবিকণ্ঠে কর্ণফুলীর দুই তীরের মানুষের আনন্দ–বেদনার গল্প সুর হয়ে উঠেছিল। এই জনপদের সংস্কৃতি, জীবনাচার এবং মানুষের মনের কথা বারবার প্রতিধ্বনিত হয়েছে তার গানে। তাই সেসব গান আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায়। উৎসবে, পার্বণে, মেলায় এখনো শেফালী ঘোষের গান ছাড়া কোনও অনুষ্ঠান জমে না চট্টগ্রামে। শুধু চট্টগ্রাম নয়, বাংলাদেশের যেকোনো অঞ্চলে তরুণ উদীয়মান শিল্পীরা শেফালীর গান গেয়ে দর্শক–শ্রোতাদের মাতিয়ে রাখেন।

আজ ৩১ ডিসেম্বর আঞ্চলিক গানের কিংবদন্তীতুল্য এই শিল্পীকে হারানোর দিন। ২০০৬ সালের এইদিনে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন গানের পাখি শেফালী ঘোষ। নন্দিত এই কণ্ঠশিল্পীর জন্ম ১৯৪৫ সালে ১১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার কানুনগোপাড়া গ্রামে। সেখানেই তার শৈশব কেটেছে।

পাঁচ ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।তার পিতার নাম কৃষ্ণ গোপাল ঘোষ এবং মাতার নাম আশালতা ঘোষ। সঙ্গীত জীবনের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েন ছোটবেলা থেকেই। শেফালী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন শেষে ভর্তি হন স্থানীয় মুক্তাকেশী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। কিন্তু স্কুলজীবন থেকেই লেখাপড়ায় অমনোযোগী হয়ে আর এগুনো সম্ভব হয়নি। 

স্কুলে পড়াকালীন সময়ে তার গানের প্রথম ওস্তাদ ছিলেন তেজেন সেন। পরবর্তীতে অধ্যক্ষ ওস্তাদ শিবশঙ্কর মিত্র, জগদানন্দ বড়ুয়া, নীরদ বড়ুয়া, মিহির নদী, গোপালকৃষ্ণ চৌধুরীসহ বিভিন্ন সংগীতজ্ঞের কাছ থেকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নিয়েছেন। পরবর্তীতে এম.এন আখতার, এম.এ কাশেম, আবদুল গফুর হালী ও সৈয়দ মহিউদ্দিন প্রমুখ গীতিকার ও সুরকারদের কাছ থেকে আঞ্চলিক গানের শিক্ষা লাভ করেন। এছাড়া বিশেষ করে স্বামী বাবু ননী গোপাল দত্ত সঙ্গীতের ব্যাপারে গান বাছাই, গানের সুর, গানের কথা ইত্যাদি নিপুণভাবে সব ধরনের সহায়তা করতেন।

শিল্পীজীবনের সূচনালগ্নে প্রথমে রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত এবং আধুনিক গান শিখতে শুরু করলেও এক পর্যায়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন তিনি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের লোকসঙ্গীত- অর্থাৎ আঞ্চলিক গান, পল্লিগীতি, মাইজভাণ্ডারী গান, পীর মুরশিদের শানে রচিত গান গাওয়ার দিকে আগ্রহী হয়ে উঠেন।

১৯৬৩ সালে, শেফালীর তখন ২২ বছর। চট্টগ্রাম বেতারের তৎকালীন আঞ্চলিক পরিচালক শেফালী ঘোষ এবং আঞ্চলিক গানের সম্রাট শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবকে আঞ্চলিক ভাষায় গান গাইতে প্রস্তাব জানালেন। এতে দুইজনই রাজি হলেন, এবং তাদের সেই দ্বৈত কণ্ঠের গান ইথারে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।

১৯৬৪ সালে সর্বপ্রথম রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রাম কেন্দ্রে নজরুল সঙ্গীতে তার নাম তালিকাভুক্ত হয়। তার প্রথম সঙ্গীত পরিবেশিত হয় ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে..’। ১৯৭০ সালে সর্ব প্রথম টেলিভিশনে তার গান সম্প্রচার করা হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে নিয়মিত শিল্পী হিসেবে গান পরিবেশন করেন। বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে ও মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শিবিরে গান গেয়ে অনুপ্রাণিত করেন।

১৯৭৪ সালে শেফালী ঘোষ প্রথম চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেন। ১৯৭৮ সালে লন্ডনের প্রখ্যাত মিলফা লিমিটেড তার গানের ১০টি ক্যাসেট এবং লংপ্লে বের করে। ঢাকা রামপুরা টেলিভিশনে কেন্দ্র উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও তিনি গান গেয়ে ভূয়সী প্রশংসা পান। বসুন্ধরা, মধুমিতা, সাম্পানওয়ালা, মালকাবানু, মাটির মানুষ, স্বামী, মনের মানুষ, বর্গী এল দেশে প্রভৃতি চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দেন তিনি। 

তার গান এবং সুখ্যাতি এখন দেশের মাটি ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে ছড়িয়ে আছে। এখনো শেফালী ঘোষের গানের কদর ফুরোইনি। শেফালী ঘোষের গাওয়া জনপ্রিয় গান গেয়ে এখনও অনেক শিল্পী স্টেজ মাতিয়ে রাখেন। দুই বাংলাতেই শেফালী ঘোষ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন শুরু থেকেই। চট্টগ্রামে থাকার কারণে অনেকটা অবহেলিত ছিলেন তিনি। শ্যাম সুন্দর ও শেফালী ঘোষ জুটি আঞ্চলিক গানের জগতে একটি মাইলফলক। 

তিনি বাংলাদেশের চট্টগ্রামরে আঞ্চলিক গানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরেছেন যা উপমহাদেশের সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছে। প্রায় পাঁচ দশকের সংগীত জীবনে তিনি প্রায় সহস্রাধিক গান গেয়েছেন। তার গাওয়া গান নিয়ে দুই শতাধিকের বেশি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বেশ কয়েকটি বাংলা চলচ্চিত্রের গানেও প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে কণ্ঠ দিয়েছেন। 

তিনি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ‘রানী’ উপাধি পেয়েছেন। চট্টগ্রাম সহ সারাদেশ তথা বিদেশেও সমান জনপ্রিয়তা পেয়েছেন শুধুমাত্র আঞ্চলিক গান গেয়ে। ২০০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর সবার প্রিয় শিল্পী শেফালী ঘোষ না ফেরার দেশে চিরতরে পাড়ি জমান। তার মৃত্যুর শূন্যতা এখনও অপূরণীয়। 

শেফালী ঘোষের গাওয়া জনপ্রিয় গানের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- ‘ওরে সাম্পান ওয়ালা’, ‘বানুরে জি অ বানু’, ‘নাতিন বরই খা’, ‘আইওরে আইওরে কুডুম’, ‘লাল মিয়ার বাড়ী’, ‘থিয়া থিয়া ও লেদুনী’, ‘ছোড ছোড ঢেউ তুলি’, ‘শ্যাম রেঙ্গুম ন যাইও’, ‘ও মারে মা’, ‘মুখক্কা গইল্যা কালা’, ‘মাইট্টা কলসি’, ‘বাইক্কা টেয়া দে’, ‘নাইয়র নিবা কই’, ‘গোলাবী ইবাকন’, ‘মালকা বানুর দেশেরে’, ‘এক্কান কথা দুছার’, ‘আঁর বাড়িত যাইও’, ‘ওরে বাস কণ্ট্রাকটার’। 

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী শেফালী ঘোষের ২০০ টিরও বেশি অডিও ভিডিও এ্যালবাম বাজারে রয়েছে। এছাড়া কলকাতা ও লন্ডনেও ক্যাসেট বের হয়েছে। শেফালী ঘোষ ব্যক্তিগতভাবে আঞ্চলিক গান গেয়ে তৃপ্ত হতে চাননি। চট্টগ্রামে নিজস্ব সংস্কৃতিকে সাথে নিয়ে কাজ করতে গর্ববোধ করতেন। কারণ, চট্টলার ভৌগলিক সীমানা ছাড়িয়ে তথা সারা বিশ্বের বাঙালিদের কাছে এই গানের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। 

দেশের মাটিতে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তিনি বিশ্বের প্রায় ২০টিরও বেশি দেশে গান করেছেন। আমেরিকার বিভিন্ন শহরে, লন্ডনের রয়েল এলভার্ট হল ও কাতার, বাহারাইন, সংযুক্ত আরব-আমিরাত, ওমান, কুয়েত, কলিকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, বার্মা, সিঙ্গাপুর, মালেশিয়া, জাপান, জর্ডান প্রভৃতি দেশে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। লন্ডনের রয়েল এলভার্ট হলে তিনি গান পরিবেশন করে প্রশংসিত হয়েছেন। 

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers