ফিচার

কৃষ্ণ চন্দ্র দে: অন্ধত্ব জয় করে যিনি হয়েছিলেন কিংবদন্তি

কামরুল ইসলাম নভেম্বর ২৮, ২০২০, ১৭:৫০:২৯

  • কৃষ্ণ চন্দ্র দে: অন্ধত্ব জয় করে যিনি হয়েছিলেন কিংবদন্তি

চোখে দেখতে পেতেন না। সেই সময়ে তেমন কোনো ব্যবস্থাও ছিল দৃষ্টিশক্তি ফেরানোর মতো। সমাজের চোখে এক প্রতিবন্ধী মানুষ; যেন পরিবারের বোঝা। কিন্তু এই প্রতিবন্ধকতাকে তিনি জয় করেছেন কণ্ঠ দিয়ে। সুরেলা কণ্ঠের যাদু ছড়িয়ে তিনি হয়েছেন স্মরণীয়-বরণীয়। ভারতীয় সঙ্গীতে রেখেছেন অসামান্য অবদান।

বলছি গায়ক, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক ও অভিনেতা কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র কথা। এই প্রজন্মের কাছে তার নামটি হয়ত অপরিচিত। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তার নামটি লেখা আছে স্বর্ণাক্ষরে। তিনি মূলত কে সি দে নামে বেশি পরিচিত।

আজ ২৮ নভেম্বর কিংবদন্তি এই সঙ্গীত ব্যক্তিত্বের প্রয়াণ দিবস। ১৯৬২ সালের এই দিনে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন কৃষ্ণ চন্দ্র দে। বিশেষ এই দিনে খ্যাতিমান এই শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র জন্ম ১৮৯৩ সালের ২৪ আগস্ট। ছোট বেলায় এক দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান তিনি। কিন্তু অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে তিনি সেই প্রতিবন্ধকতাকে পরাজিত করেছেন। এবং যাপন করেছেন প্রায় স্বাভাবিক জীবন।

শৈশব থেকেই সঙ্গীতের প্রতি অগাধ ভালবাসা ছিল কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র। ওস্তাদ বদল খানের কাছে খেয়াল, দানী বাবুর কাছে ধ্রুপদ, রাধারমণের কাছে কীর্তন ও কণ্ঠে মহারাজের কাছে তবলা শেখেন তিনি।

২০ বছর বয়সে সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন কৃষ্ণ চন্দ্র দে। ১৯১৭ সালে গ্রামোফোন কোম্পানী তার প্রথম রেকর্ড বের করে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতে তিনি নিজের আলাদা এক অবস্থান তৈরি করে নেন। তবে কে সি দে সবচেয়ে বেশি সাফল্য পেয়েছেন কীর্তনে। তার গাওয়া কীর্তন ও এই ঘরানার গান এখনো সমানভাবে জনপ্রিয়।

কৃষ্ণ চন্দ্র দে কেবল গান গাইতেনই না, তিনি লিখতেন, সুর করতেন এবং সঙ্গীত পরিচালনাও করতেন। তার সৃষ্ট ‘স্বপন যদি মধুর হয়’, ‘তোমার কাজল আঁখি’, ‘তুমি গো বহ্নি শিখা’, ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হল বলিদান’- এসব গান কালের সীমানা পার করে এখনো মানুষের মুখে মুখে।

কীর্তন, বাউল ও ভাটিয়ালী গানগুলোর পাশাপাশি কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র গাওয়া হিন্দি, উর্দু, গজলও জনপ্রিয় হয়ে উঠে। তার হাত ধরেই বাংলা গানে ঠুমরী, দাদরা ও গজলের প্রচলন হয়। নিজের লেখার বাইরে কে সি দে খুব বেছে বেছে গান করতেন। বিখ্যাত কবি হেমেন্দ্র কুমার রায়, শৈলেন রায়, অজয় ভট্টাচার্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখের লেখা গানে সুর দিতেন তিনি।

কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র অবিশ্বাস্য প্রতিভা হচ্ছে অভিনয়। তিনি থিয়েটার ও সিনেমায় অভিনয় করে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। ১৯৩১ সালে কলকাতায় তিনি নিজেই নাটকের দল প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর দারুণ ব্যস্ততায় কেটেছিল মঞ্চ নাটকের জীবন।

গান আর অভিনয় দিয়ে কলকাতায় যখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তখন কে সি দে পাড়ি জমান মুম্বাইয়ে। সেখানে গিয়ে বহু হিন্দি সিনেমার গান করেন তিনি। তার লেখা-সুরে মোহাম্মদ রফি, মুকেশ এবং কিশোর কুমারের মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা গান গেয়েছেন।

১৯৪৭ সালে পুনরায় কলকাতায় ফিরে আসেন কে সি দে। সেখানে তিনি সিনেমা প্রযোজনা শুরু করেন। বেশ কয়েকটি সফল সিনেমা প্রযোজনা করেছিলেন তিনি। ১৯৫৭ সালে ‘একতারা’ সিনেমাটি প্রযোজনা করেছিলেন এবং এতে অভিনয়ও করেন কে সি দে। এটিই ছিল তার শেষ সিনেমা।

দৃষ্টিহীন থাকার কারণে কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন তার ভাতিজা প্রবোধ চন্দ্র দে। যিনি পরবর্তী সময়ে মান্না দে নামে কিংবদন্তি শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। মান্না দে’র নামটি মূলত তার চাচা কে সি দে দিয়েছিলেন। আর তার গানের চর্চাও চাচার হাত ধরেই। চাচার সুবাদে উপমহাদেশের বিভিন্ন কিংবদন্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ ও গানের দীক্ষা পেয়েছিলেন মান্না দে।

শুধু মান্না দে নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের আরেক কিংবদন্তি শচীন দেব বর্মন বা এস ডি বর্মণের সঙ্গীতে পথচলাও শুরু হয়েছিল কে সি দে’র হাত ধরে।

বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারি কৃষ্ণ চন্দ্র দে অভিনিত সিনেমাগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য’, ‘প্রহ্লাদ’, ‘অনির্বাণ’, ‘দৃষ্টিদান’, ‘পূরবী’, ‘ইনসান’, ‘তামান্না’, ‘চাণক্য’, ‘সাপুড়ে’, ‘দেশের মাটি’, ‘ধারতি মাতা’, ‘বিদ্যাপতী’, ‘দেবদাস’, ‘গৃহদাহ’, ‘মঞ্জিল’, ‘মায়া’, ‘পূজারিম’, ‘ধুপ চাহো’, ‘ইনকিলাব’, ‘পুরান ভগত’ ও ‘চণ্ডীদাস’ ইত্যাদি।

কি সি দে চলে গিয়েও তিনি তার অসাধারণ সব সৃষ্টিকর্মে বেঁচে আছেন আজও। তার পথ অনুসরণ করে বরণীয় হয়েছেন অনেকে। তাই সময়ের পালাবদলে বছরের পর বছর চলে যাবে, কিন্তু কৃষ্ণ চন্দ্র দে বেঁচে থাকবেন ভারতীয় সঙ্গীত ইতিহাসের উজ্জ্বলতম এক নক্ষত্র হয়ে।

 

 

নিউজজি/কেআই

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers