ফিচার

চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের জন্মদিন আজ

নিউজজি প্রতিবেদক জানুয়ারী ১৮, ২০২১, ১৫:২১:৩০

  • ছবি: ফাইল

ঢাকা: মোনাজাত উদ্দিন। চারণ সাংবাদিক হিসেবে যিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন। গ্রামে-গঞ্জে, পথে পথে ঘুরে খবরের পেছনে থাকা খবর সংগ্রহ করে লিখতেন যিনি। এটাই যার নেশায় রূপ নিয়েছিল। যা ছিল দেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা। সেই নতুন মাত্রা যোগ করা চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের ৭৬তম জন্মবার্ষিকী আজ (১৮ জানুয়ারি)। ১৯৪৫ সালের ১৮ জানুয়ারি রংপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন প্রথিতযশা এই সাংবাদিক।  

পথে প্রান্তরের অনুসন্ধানে গিয়ে জীবনেরও যবনিকা ঘটে চারণ সাংবাদিকের। ১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ফুলছড়ি থানাধীন যমুনা নদীতে কালাসোনার ড্রেজিং পয়েন্টে দুটি নৌকাডুবির তথ্যানুসন্ধান করতে অসুস্থ শরীর নিয়ে যাত্রা শুরু করেন গাইবান্ধায়। যাওয়ার পথে ‘শেরেবাংলা’ নামক ফেরিতে তিনি দুর্ঘটনায় পড়েন। ফেরির ছাদ থেকে হঠাৎ করেই পানিতে পড়ে যান তিনি। স্থানীয় নৌকার মাঝিরা তাকে তাৎক্ষনিকভাবে উদ্ধার করতে পারলেও তাকে বাঁচানো যায়নি। তবু তিনি তার কর্মের মাধ্যমেই অমর হয়ে আছেন আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায়।

সাংবাদিকতার নেশায় তিনি চষে বেড়িয়েছেন উত্তরবঙ্গের মাঠের পর মাঠ, গ্রাম থেকে গ্রামান্তর। কথা বলেছেন, একেবারে শেকড় থেকে তিনি সৃষ্টি করেছেন সংবাদ ভাষ্য, প্রতিবেদন, ফিচার। তার প্রতিটি প্রতিবেদনই ছিল গ্রাম বাংলার অকৃত্রিম চিত্র আর মানুষ ও সমাজের বাস্তব মুখচ্ছবি। জীবদ্দশায় তিনি নিজেকে ‘তৃণমূল মানুষের সংবাদকর্মী’ হিসাবে দাবি করতেন।

মোনাজাত উদ্দিন-এর সাংবাদিকতা শুরু ১৯৬৬ সালে তিনি দৈনিক আজাদ পত্রিকা দিয়ে। এরপর ১৯৭২ সালের মার্চে স্বাধীন চিন্তা, বিশ্বাস আর আদর্শের ভিত্তিতে প্রকাশ করেন ‘দৈনিক রংপুর’।

মূলত তিনি দৈনিক সংবাদে পথ থেকে পথে ধারাবাহিক রিপোর্টের জন্য খ্যাতি লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে দৈনিক সংবাদে যোগ দেয়ার পর থেকে তিনি মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন পত্রিকাটির সাথে। বিশ বছর একটানা ‘সংবাদ’ এ কাজ করার পরে ১৯৯৫ সালের ২৪ এপ্রিল দৈনিক জনকণ্ঠে সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে যোগদান করেন ।

‘মোনাজাত উদ্দিনের সংবাদ সংগ্রহের স্টাইল ও নিষ্ঠা জড়িয়ে গিয়েছিল; কোথাও ভঙ্গী দিয়ে চোখ ভোলানোর আয়োজন ছিল না। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, ফলোআপ প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি অনন্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। গ্রাম বাংলার জনজীবনের একটা নিখুঁত তথ্য নির্ভর এবং একই সঙ্গে সংবেদনশীল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ও চিত্ররূপময় বর্ণনা এবং চিত্র তিনি দেশবাসীকে উপহার দিয়েছেন খবরের মাধ্যমে।’ তার সম্পর্কে এই মন্তব্য প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট সন্তোষ গুপ্ত’র।

মোনাজাত উদ্দিন কাজের নিষ্ঠতার জন্য অনেক সম্মাননাও পেয়েছিলেন। ১৯৮৪ সালে ‘সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী স্মৃতি পদক’, দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত ‘মানুষ ও সমাজ’ প্রতিবেদনের জন্য সালে ফিলিপস্ পুরস্কার, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স পুরস্কার, ১৯৯৫ সালে অশোকা ফেলোশিপ লাভ করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদক একুশে পদক (মরনোত্তর) লাভ করেন।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কাজেও অংশগ্রহণ ছিল তার। গ্রামীণ এলাকায় মানুষের কুসংস্কার, অন্ধতা দূর করতে তিনি তরুণদের নিয়ে সংগঠন করেছেন। কখনো তাদের নিয়ে নাটক করিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে। তিনি নিজেও ছিলেন একজন গীতিকার ও নাট্যকার। রংপুর বেতারে নিয়মিত কাজ করতেন। তার একাধিক নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। যদিও চারুশিল্পে তার তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না কিন্তু নিজের অধ্যাবসায়ের ফলে তিনি অনেক বই ও ছোট কাগজের প্রচ্ছদ করেছেন। ছিলেন দক্ষ ফটোগ্রাফারও।

রিপোর্টিং ছাড়াও গল্প, কবিতা, ছড়া ও নাটক রচনায় তার দক্ষতা ছিল। মৃত্যুর আগে ৯টি ও পরে ২টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তার। পাশাপাশি লিখেছেন জীবনের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ নানা ঘটনা। তার বইগুলোর মধ্যে রয়েছে-‘পথ থেকে পথে’, ‘সংবাদ নেপথ্য’, ‘কানসোনার মুখ’, ‘পায়রাবন্দের শেকড় সংবাদ’,  ‘নিজস্ব রিপোর্ট’,  ‘ছোট ছোট গল্প’,  ‘অনুসন্ধানী রিপোর্ট’: গ্রামীণ পর্যায়’,  ‘চিলমারীর এক যুগ’,  ‘শাহ আলম ও মজিবরের কাহিনী’,  ‘লক্ষীটারী’,  ‘কাগজের মানুষেরা’। এ ছাড়াও, মাসিক মোহাম্মদি, দৈনিক আজাদ, সওগাত ও অন্যান্য পত্র-পত্রিকায় তাঁর বেশ কয়েকটি গল্প প্রকাশিত হয়।  নাটকের একমাত্র প্রকাশিত বই ‘রাজা কাহিনী’। তিনি প্রচুর ছড়াও লিখেছেন।

নিউজজি/জেডকে

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers