ফিচার

আপনার প্রতিচ্ছবি প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করব

শহীদুল্লাহ ফরায়জী জুলাই ২৬, ২০২১, ০৬:৩৬:৪২

  • আপনার প্রতিচ্ছবি প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করব

চিরকালীন ভ্রমণ শুরু করেছেন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর। ভ্রমণরত আত্মার সঙ্গে ফকির আলমগীর এখন ঊর্ধ্বাকাশে নীল দিগন্তের ওপারে অবস্থান গ্রহণ করেছেন। এতদিন তিনি গান পরিবেশন করেছেন মানুষের সৃষ্ট সুর ও ছন্দে। এখন থেকে হয়তো মহাশূন্যের ছন্দে এবং ঐশ্বরিক সুরে চিরদিনের মতো অজস্র নক্ষত্রের মাঝে বিচরণ করে সংগীত পরিবেশন করবেন।

ফকির আলমগীর আমার খুব ঘনিষ্ঠজন। তার মৃত্যুতে আমি তার নৈকট্য ও প্রচ- প্রভাব আমার বেদনার ভেতর অনুভব করছি। ফকির আলমগীরের সঙ্গে সম্পর্ক কত গভীর ও সীমাহীন তা আমার পক্ষে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমি উপলব্ধি করছি ফকির আলমগীরের অনুপস্থিতির বেদনা নিঃসন্দেহে দীর্ঘস্থায়ী হবে।

জাতি হিসেবে আমরা এমনই আকাশের যে তারা অদৃশ্য হয়ে যায় তাকে অনুসন্ধান করতে শুরু করি কিন্তু দৃশ্যমান থাকার সময় যথার্থ মর্যাদা দেই না। আমি শুধু দেখেছি জীবনমুখী সংগ্রামী গানের জন্য তার অনন্ত তৃষ্ণা, আর দেখেছি মানুষের সঙ্গে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আকুল আকাক্সক্ষা। মানুষকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে, বরণ করার ক্ষেত্রে বা সংবর্ধিত করার ক্ষেত্রে ফকির আলমগীরের স্বতঃস্ফূর্ততা, প্রাণবন্ততা এবং উজ্জ্বল হাসি অতুলনীয় ও বিরল। যে কোনো জায়গায় তার কণ্ঠস্বরের উচ্চতা এবং গভীরতা তার উপস্থিতিকে অনিবার্য করে তুলত।

হাজার বছরের বাঙালি জীবনে যে দুটি ঘটনা ঐতিহাসিকতায় তারকা উজ্জ্বল সে দুটি ঘটনার একটিতে জন্মসূত্রে আরেকটিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সম্পৃক্ত গণসংগীতের দিকপাল ফকির আলমগীর। একটি হলো একুশে ফেব্রুয়ারি আর অন্যটি হলো ১৯৭১। এই দুটোই বাঙালির জাতিসত্তার আত্মার নির্মাতা, জাতির অনন্ত গভীর সম্পদ।

একটিতে স্বাধীনতার স্বপ্ন বপন করা হয়েছিল আর আরেকটি সে স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করেছে।

২১ ফেব্রুয়ারি এবং ৭১ এই দুটি উচ্চারণ ছাড়া বাঙালির আত্মঅনুসন্ধানের আর কোনো বিকল্প নেই।

ফকির আলমগীর কী সৌভাগ্যবান! ২১ ফেব্রুয়ারি ফকির আলমগীরের জন্মদিন। আবার ৭১ বছর বয়সে ভ্রমণ সমাপ্তি করে অনন্তলোকে যাত্রা শুরু করেছেন।

১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করে ফকির আলমগীর ভাষা আন্দোলন কালের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছেন। ’৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে স্বাধীনতার লড়াইয়ে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন। পরিশেষে ’৭১ সালের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণায় স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ৭১ বছর বয়সে প্রত্যাবর্তন করেছেন, কী দারুণ আশীর্বাদপ্রাপ্ত ও সৌভাগ্যবান।

ফকির আলমগীর গান গেয়েছেন মানুষের ভেতরের ঘুমন্ত শক্তিকে জাগ্রত করার জন্য। শুধু বিনোদন নয়- মানুষের আত্মিক উত্তরণ এবং সংগ্রামীবোধের বহির্প্রকাশ ঘটেছে তার গানে। অধিকারহারা বঞ্চিত মানুষের জন্য সংগীত পরিবেশনের ক্ষেত্রে গণসংগীতকে প্রাধান্য দেওয়া ছিল তার নিরন্তন সংগ্রামের ফল। ষাটের দশক থেকেই তিনি প্রচলিত ধ্যান-ধারণাবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে গণসংগীত এবং আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। সেসব উত্তাল দিনগুলোতে মিছিল মিটিংয়ে অংশগ্রহণের সঙ্গে জনগণের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক সংগীত পরিবেশন করে একজন বীরের কর্তব্য পালন করতে শুরু করেন। গণমানুষই ছিল তার চিন্তা-চেতনার সংকল্প।

ফকির আলমগীর বংশীবাদক হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। ছাত্র রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন। আন্দোলন-সংগ্রামের মাঝেও লেখাপড়ায় কোনো বিরতি দেননি। রাজনীতির উত্তাল দিনগুলোর মাঝেও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে গণসংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে নিজেকে বিশেষ উচ্চতায় প্রতিস্থাপন করেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসাবে রাষ্ট্রের প্রতি তার আনুগত্য প্রদর্শন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

স্বাধীনতার পর দেশজ সংগীতের সঙ্গে পাশ্চাত্য সুরের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে পপ সংগীতের ধারা বিকশিত করার ক্ষেত্রেও ফকির আলমগীরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে গণসংগীত এবং পপ সংগীত দুটো ধারাতেই নিজেকে তিনি ভিন্নমাত্রায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন যতদিন মানুষ থাকবে, আন্দোলন-সংগ্রাম থাকবে ততদিন গণসংগীত টিকে থাকবে।

আমরা দেশবাসীও বিশ্বাস করি জাতি অনাগতকাল ধরে মনে রাখবে গণসংগীতের এই কিংবদন্তি ফকির আলমগীরকে। ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে... এই গানেই ফকির আলমগীর অগণিত বাঙালির মণিকোঠায় ঠাঁই পেয়ে যান। দেশ-বিদেশে বাঙালির কাছে সংবর্ধিত হতে থাকেন। অন্যদিকে মে দিবসে ‘নাম তার ছিল জন হেনরি’ এই গানটি ফকির আলমগীর গেয়ে গেয়ে ‘মে দিবসের’ জাতীয় সংগীতে রূপান্তর করেন।

ফকির আলমগীরের যেসব গান তার আকাক্সক্ষাকে প্রতিনিধিত্ব করেছে সেগুলো হচ্ছে, ‘কালো কালো মানুষের দেশে’, ‘সান্তাহার জংশনে দেখা’, ‘নাম তার ছিল জন হেনরি’, ‘মোর সখিনার কপালের টিপ’, ‘বনমালী তুমি’, ‘মায়ের একধার দুধের দাম’, ‘আহারে কাল্লু মাতব্বর’, ‘ঘর করলাম নারে আমি’ এবং ‘ও জুলেখা’সহ অসংখ্য গান।

তিনি পৃথিবীর বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা নেলসন ম্যান্ডেলাকে নিয়ে অসাধারণ গান করেছেন এবং বাংলাদেশে এসে স্বয়ং নেলসন ম্যান্ডেলা গানটি শুনে মুগ্ধ হয়েছেন। নেলসন ম্যান্ডেলাকে নিয়ে গানটি ফকির আলমগীরকে বিরল সম্মান এনে দেয়।

তিনি নিজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর আয়োজন দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। কত নবীন-প্রবীণ শিল্পীর সমাবেশ ঘটেছে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর আয়োজনে। সংকটে দাবি আদায়ে উৎসব-পার্বণে সোচ্চার ছিলেন ফকির আলমগীর।

সংগীতচর্চা ও সংগীত পরিবেশন, সংগঠনে নেতৃত্ব দেওয়াসহ অনেক সংগঠনে যুক্ত থেকেও তিনি নিয়মিত লেখালেখি করতেন। সংগীতের ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় ‘একুশে পদক’সহ অনেক সম্মাননা পেয়েছেন।

২০ বছর ধরে ফকির আলমগীর একুশে ফেব্রুয়ারি এবং তার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কয়েকবার গিয়েছি কিন্তু প্রতিবার যেতে পারিনি জাগতিক ব্যস্ততায়।

কী এক অসাধারণ আগ্রহ নিয়ে, অনুভূতির গভীরতা দিয়ে ফকির আলমগীর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানাতেন। আজ অনুতাপ হচ্ছে, কেন ফকির আলমগীরের সব আমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারিনি। কেন ফকির আলমগীরের প্রচ- আগ্রহকে যথার্থ সম্মান জানাতে পারিনি!

ফকির আলমগীর আপনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন সখিনা আপনাকে ভুলে গেছে কিনা, না শুধু সখিনা কেন আমরা কেউ আপনাকে ভুলিনি। যদিও আপনি আপনার ঢাকা শহরে রিকশা চালানো ছেড়ে দিয়ে ঊর্ধ্ব গগনে পাড়ি দিয়েছেন তবু আমরা কেউ আপনাকে ভুলিনি।

রিকশার চাকায়, কৃষকের লাঙলে, শ্রমিকের কাস্তে এবং মায়ের শাড়ির আঁচলে আপনার প্রতিচ্ছবি আমরা প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করব। নদীর পাড়ে বসে, শস্যক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে এবং প্রতিবাদী মিছিলে আমরা আপনার গান শুনব এবং গাইব। ফকির আলমগীর, আপনার সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হবে না, কথা হবে না, আপনাকে বুঝি চিরজনমের মতো হারালাম!

আপনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দায় পূরণ করতে পারিনি, আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন।

যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন।

জয়তু ফকির আলমগীর।

শহীদুল্লাহ ফরায়জী : গীতিকার

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers