ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ : সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার

শহীদুল্লাহ ফরায়জী ১ এপ্রিল , ২০২১, ১৪:৩৭:৫৫

  • ছবি: নিউজজি২৪

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি অগণিত মানুষের আত্মদানের ফসল। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালির জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত। শোষণ ও নিপীড়নমূলক তদানীন্তন রাষ্ট্রব্যবস্থা উচ্ছেদ এবং তার স্থলে একটি মানবিক, নৈতিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্য নিয়েই মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়। সশস্ত্র সংগ্রাম মুক্তিসংগ্রামে রূপান্তরিত হয়েছিল গণবিরোধী রাষ্ট্রব্যবস্থার অবলুপ্তি ঘটিয়ে আবার একটি নতুন নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য নয়, মুক্তি সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা চিরদিনের জন্য উচ্ছেদ করার প্রয়োজনে। ঔপনিবেশিকতার জোয়াল এবং সব ধরনের বৈষম্য থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই আমাদের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে একটি সুস্পষ্ট দর্শনের প্রতিফলন ঐতিহাসিকভাবেই অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দর্শন ঘোষণা করা হয়েছে। এই ইতিহাসবোধ থেকে প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল মুক্তিসংগ্রামের পর রাষ্ট্র বিনির্মাণে ঘোষিত দার্শনিক ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি নির্ধারণ। উল্লেখ্য, এ দর্শনেই শোষণ, অবিচার, অন্যায় বিলুপ্তির মাধ্যমে ন্যায্যতার ভিত্তিতে গোটা মানবজাতির মুক্তির সম্ভাবনা বিদ্যমান। ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম...।’ এটাই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, যা উচ্চমূল্যবোধসম্পন্ন। এটা বাঙালির মহৎ অর্জন। এ ত্রয়ী দর্শন শোষণ ও বৈষম্য থেকে মুক্তির নতুন পথের সন্ধান দেয়, বিদ্যমান অমানবিক রাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে মানবিক রাষ্ট্রের রূপরেখা উপস্থাপন করে। আমাদের রক্ত¯œাত মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্র এ ত্রয়ী আদর্শের ভিত্তিতেই নির্মিত হবে অন্য কোনো পন্থায় নয়। বিদ্যমান রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত সংকট, সংকটের স্বরূপ বিশ্লেষণ করতে হবে ওই ত্রয়ী দর্শনের ভিত্তিতে। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পর ঐতিহাসিকভাবে প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল এই ত্রয়ী দর্শন নিয়ে জাতীয়ভাবে গভীর পর্যালোচনা করে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি নির্ধারণ করা। আমাদের এই ত্রয়ী দর্শন ছিল প্রচলিত দার্শনিক চিন্তা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক।

একটি রাষ্ট্রকে আদর্শের ভিত্তিতে নির্মাণ করা যায় এবং সে আদর্শের ভিত্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের সশস্ত্র সংগ্রামকে জনগণ মুক্তিসংগ্রামে রূপান্তর করেছিল। সুতরাং অমানবিক ও শোষণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্বহাল করার কোনো সুযোগ আমাদের নেই। ধার করার কোনো দর্শনে আমাদের কাক্সিক্ষত রাষ্ট্র বিনির্মাণ হবে না। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার- এই তিন আদর্শের বাস্তব প্রয়োগ মানবসত্তার প্রকৃত মুক্তি আনতে পারে। এই আদর্শিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মানুষ তার ক্ষমতা ও স্বরূপ সম্পর্কে সচেতন হবে। এই সচেতনতা একটি জ্ঞাননির্ভর সমাজের উন্মেষ ঘটাবে এবং ব্যক্তি তার পরিপূর্ণ আত্মবিকাশের সুযোগ লাভ করবে। এই দর্শন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ফসল। এই আদর্শ অর্জনের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে আত্মদান করার জন্য লাখো মানুষকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামকে মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তর করেছি। সুতরাং স্বাধীনতার উদ্দেশ্য শুধু জাতীয় ভূখ- বা পতাকা অর্জনই নয়, স্বাধীনতা মানে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি। অনেকেই এ গভীর সত্যকে উপলব্ধি করতে সামর্থ্য হচ্ছেন না। মুক্তিযুদ্ধের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় দার্শনিক ভিত্তি উপেক্ষা করে এবং মতাদর্শিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে রাষ্ট্রীয় শাসনক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করাই মুখ্য হয়ে পড়ে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে থাকে। দলীয় শাসন, ব্যক্তির শাসন, সামরিক শাসন ও কর্তৃত্ববাদী শাসনে রাষ্ট্রে এখন দুর্বৃত্ত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

সাম্য (Equality) : সাম্য প্রত্যেক ব্যক্তির জীবন এবং সর্বোচ্চ প্রতিভা অর্জনের জন্য রাষ্ট্র সমান সুযোগ নিশ্চিত করে। ব্যক্তির বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ, হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার থেকে অব্যাহতি দেবে রাষ্ট্র। সমাজ বা রাষ্ট্রে বৈষম্যের বিষয়গুলো চিহ্নিত করা এবং বৈষম্য দূরীকরণ, সমান সুযোগের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা আমাদের রাষ্ট্রের জন্য জরুরি। সমাজে অসমতা গড়ে উঠেছে বিভিন্ন রীতিনীতি ও পদ্ধতি অনুসরণের কারণে। সামাজিক মর্যাদার অসমতার জন্য বহু মানুষের প্রকৃতি প্রদত্ত সক্ষমতা বিনষ্ট হয় এবং মানুষে মানুষে বিভেদ বৃদ্ধি পায়। এই অসম সামাজিক অবস্থানের কারণে কেউ কেউ অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে, দাসত্বের ন্যায়চিত্র উপস্থাপন করে আর কেউ কেউ তাদের খেয়ালখুশির তাঁবেদার করতে বাধ্য হয়। সংস্কৃতিবান ও সংস্কৃতবিহীন তকমা লাগিয়ে মানুষের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশনা করে। ফলে সমাজের সব মানুষ বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে ছিটকে পড়ে এবং অসৎ, অধঃপতিত ও নীতিবিবর্জিত সমাজের উদ্ভব ঘটে।

অসাম্যের সামান্য কারণও মানবজীবনে অসামান্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অসাম্যের কারণেই সমাজে একজন শক্তি প্রয়োগের সুযোগ পায়, আরেকজন শঠতার আশ্রয় নেয়। সামাজিক সাম্যে নির্দিষ্ট সমাজের সব লোকের সমান অধিকার, স্বাধীনতা ও মর্যাদা অক্ষুণœ থাকে। সাম্যের প্রয়োগ হলে নাগরিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা, সম্পত্তির অধিকার এবং নির্দিষ্ট সামাজিক পণ্য ও সামাজিক পরিষেবায় সমান প্রবেশাধিকার অন্তর্ভুক্ত হয়। আমাদের সমাজে বহু বছর ধরে অনেক ক্ষেত্রেই অসাম্য বিরাজ করছে। অধিকতর ধনসম্পদ অর্জন, সম্মান ও সুযোগের কারণে অন্য মানুষের কাছ থেকে জোর করে আনুগত্য আদায়- এসবকে অবশ্যই রাজনৈতিক এবং নৈতিকভাবে অপসারণ করতে হবে। প্রখ্যাত দার্শনিক জ্যাক রুশো বলেছেন, সমাজবদ্ধ মানুষের মধ্যে সম্পদের উদ্ভব হওয়ায় মানবকুলে অসমতা সৃষ্টি হয়েছে এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো মানবকুলে দাসত্বের জন্ম দিয়েছে। সুতরাং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক- এ তিন ক্ষেত্রেই সাম্য নিশ্চিত করতে হবে।

মানবিক মর্যাদা (Human dignity) : মানবিক মর্যাদা হচ্ছে পরম। তা মানুষের অন্য সব মূল্যবোধ থেকে ভিন্ন। মানবিক মর্যাদা যেহেতু পরম, তাই এটা রাষ্ট্র বিনষ্ট করতে পারে না। মানুষের মানবিক মর্যাদা কোনো কিছুর সঙ্গে বিনিময়যোগ্য নয়। আমাদের সংবিধানে জরুরি অবস্থা জারি করলে মৌলিক অধিকারসহ সমাবেশ করার অধিকার, বাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে এবং সাময়িকভাবে সব অধিকার স্থগিত করতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র কোনো অবস্থাতেই মানবিক মর্যাদা স্থগিত করতে পারে না। যেহেতু মর্যাদার প্রতিকল্প নেই, তাই জীবনের মর্যাদা অপরিহার্য। জীবনকে যথার্থ মর্যাদাপূর্ণ করার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হয়। মানবসমাজে প্রত্যেকে প্রত্যেকের মর্যাদা সুরক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। মানুষ যেদিন উচ্চস্তরের চেতনা ও উচ্চস্তরের নৈতিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেদিন থেকে মানুষ মর্যাদার সুরক্ষা দিতে শুরু করেছে। মর্যাদা ছাড়া মানুষের জীবনের অন্য কোনো মূল্য নেই। মর্যাদাবিহীন মানুষ মানবেতর স্তরে অধঃপতিত হয়। তা মানুষের জন্য সত্যি লজ্জাকর। মানবিক মর্যাদা, অর্থসম্পদ বা প্রযুক্তি দ্বারা অর্জন করা যায় না, মানবিক মর্যাদা অর্জন করতে হয় কেবল নৈতিক ক্ষেত্রে। মানবিক মর্যাদা সুরক্ষা দেওয়াই আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দর্শন। দার্শনিক কান্ট বলেছেন, সৃষ্টির রাজত্বে সবকিছুর হয় মূল্য আছে, নয়তো আছে মর্যাদা। যারই কোনো মূল্য আছে, তাকে অন্য কিছু যা সমমূল্যের, তার দ্বারা বদলানো যায়। অপরদিকে যা কিছু সব মূল্যের ঊর্ধ্বে এবং সেই জন্য তার কোনো সমতুল্য কিছু নেই, তার আছে মর্যাদা। আলবার্ট সোয়েটজার মনে করেন, সার্বিক মানদ- হিসেবেই জীবনের মর্যাদার ওপর সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়া উচিত। জীবনের মর্যাদার চেয়ে মূল্যবোধের ক্ষেত্রে বড় আর কিছু থাকতে পারে না। অন্যকিছুকে বড় করে দেখার যে কোনো চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত মানবতা অপমানে পর্যবসিত হবে।

সামাজিক সুবিচার (Social justice) : সামাজিক ন্যায়বিচার একটি রাজনৈতিক ও দার্শনিক তত্ত্ব। তা সমাজে ব্যক্তির ন্যায়সঙ্গত অধিকারকে সুরক্ষা দেয়। সামাজিক ন্যায়বিচার জীবন, সম্পদ ও মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে সমঅধিকার নিশ্চিত করে। মানবজীবনের সব ক্ষেত্র ন্যায়বিচারের আওতায় রাখাই হচ্ছে সামাজিক সুবিচার। এই ত্রয়ী আদর্শ কেন্দ্র করেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। এ ত্রয়ী আদর্শকে ব্যাহত করতে পারে, এমন কোনো আইন প্রণয়ন করা যাবে না- এটাই আদর্শের নির্দেশনা। এই আদর্শের বাইরে বাংলাদেশ বিনির্মাণ করার কারও কোনো সুযোগ নেই।

আমরা যদি আমাদের অঙ্গীকার এবং প্রতিশ্রুতি মোতাবেক সমাজ ও রাষ্ট্রে মৌলিক রূপান্তর না করি, তা হলে আমাদের রাষ্ট্র বড় বিপজ্জনক ঝুঁকিতে আবর্তিত হবে। সুবর্ণজয়ন্তীতে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের। 

লেখক: গীতিকার

faraizees@gmail.com

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers