ফিচার
  >
বিশেষ কলাম

‘অন্তরতর সে…’

অঙ্কন চট্রোপাধ্যায় ১৩ জানুয়ারি , ২০২২, ১৫:২৬:৪০

  • ছবি: সংগৃহীত

প্রত্যেক বছর শরতের পর হেমন্ত গডিয়ে শীত আসে। সেই সাথে আসে নানা উৎসব। এইসময় চারিদিকে শুরু হয় পরিচিত শিল্পীদের গান গাওয়া অনুষ্ঠান। রং-রস-বর্ণ-গন্ধ কলকাতা শহরজুড়ে। আমার যারা রবীন্দসঙ্গীত প্রেমী, তাঁরা এই সময়টা আসার আগে থেকেই কয়েকজন মানুষের দিকে সম্মিলিতভাবে চেয়ে থাকি প্রিয় শিল্পীদের অনুষ্ঠানের আশায়। তাঁরা নিজেরা শিল্পী নন, কিন্তু শিল্পীর শিল্পকে তাঁরা দায়িত্ব নিয়ে আমাদের সঙ্গীকজগতের তারকাদের নিয়মিত দেখতে পাই।

যখন কলকাতা শহরে প্রথম আসি তখন এরকমই এক সুহৃদয়ার সৌজন্যে প্রথম দেখা পাই আমার স্বপ্নের সরস্বতীকে। দিনটাও মনে আছে, ৫ই জানুয়ারি ২০১৫। রবীন্দ্রনাথের গান যবে থেকে শুনেছি তাঁর কণ্ঠে, যা পেয়েছি তেমনটা আর কোথাও কখনো পাইনি। তাকে শিল্পী হিসেবে বরাবর অদ্বিতীয়াই মনে হয়েছে আমার। কিন্ত তিনি মানুষ হিসেবে অদ্বিতীয়া সেটা তখনও জানিনা। একথা শুধু আমারই মনে হয়েছে এমন নয়। অর্মত্য সেন তার বই ‘হোম ইন দ্য ওয়াল্ড; অ্যা মেমোয়ার’ বইতে শান্তিনিকেতনের উল্লেখ্যযোগ্য শিল্পীদের নাম উল্লেখ্য করতে গিয়ে শান্তিদেব ঘোষ, কণিকা বন্দ্যেপাধায়, নীলিমা সেন, সুচিত্রা মিত্র, শৈলজারঞ্জন মজুমদার মতন মানুষদের সঙ্গে এই অদ্বিতীয়ার নামটিও উল্লেখ্য করেছেন। নিজের ছবিতে তাঁকে ‍দিয়ে গাওয়াতে পরেননি বলে আক্ষেপ করেছিলেন চিত্র পরিচালক মৃণাল সেন। বলেছিলেন, ‘আমি তো এখন ছবি করি না, তাই আমার দুর্ভাগ্য আমি ওঁকে আমার ছবিতে ব্যবহার করিনি।’ অবশ্য শ্রোতাদর্শকদের একবারে আশাহত হাবার কারণ নেই। পরেরদিকে পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ তাকে একটি ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন। গাইয়েছিলেন ‘এ পরবাসে রবে কে’। ‘সব চরিত্র কাল্পনি’ ছবিতে একটি স্মরণসভায় গান গাইছেন তিনি। ক্যামিও চরিত্রে অর্থ্যাৎ তিনি তাঁর নিজের পরিচয়েই গাইবেন। সঙ্গে জয় গোস্বামীর কবিতা কালো পাড় সাদা শাড়িতে, ঝিলের মতন দুটি আনত চোখে, অলঙ্কার বলতে কেবল খোঁপার জুঁইফুল। মঞ্চের পেছনের একরাশ অন্ধকারকে তুচ্ছ করে আলোকময়ী বিষাদসরস্বতী গাইছেন ‘তেমন কেহ নাহি এ প্রান্তর হায় রে…’। --- রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। রবীন্দ্রগানে আমার একমাত্র আরাধ্যা। আজ তার জন্মদিন।

কলকাতায় রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে সকলে ছোট করে বন্যাদি বলেন। বন্যাদি আসলে সবারই বন্যাদি। ছোট-বড় সবার। বাংলাদেশের মানুষজন দিদিকে আপু ডাকতেই বেশি অভ্যস্ত। অথচ বন্যাদি সেখানেও বন্যা আপু না হয়ে বন্যাদি। জীবনে প্রথম বোধহয় আমি চৌতালি দাশগুপ্তকেই শুধুমাত্র বন্যা ডাকতে শুনেছি। বন্যাদি নিজেও একবার গল্প করে বলেছিলেন সাদী মহম্মদ নাকি এই বন্যাদি ডাক বাংলাদেশে বিখ্যাত করেছেন। উল্লেখ্যযোগ্যভাবে, সাদী মহম্মদ আর বন্যাদির দ্বৈত রবীন্দ্রগান ছাড়া্ও পুরানো আধুনিক গানও আছে অনেক। ‘পৃথিবী আমারে চায়’ এলবামের একটা দ্বৈত গান ‘এপারে তুমি রাধে ওপারে আমি’ শুনেছিলাম কোন ছোটবেলায়। টিভিতে তখন এখানকার মত সারাদিন বলিউডি গানের এত দহরম মহরম ছিল না। এইসব ভালো ভালো বাংলা গানও তখন চলত। তাতে করে ছোটদের অনেক উপকার হত। টেলিভিশনের নেশায় বসে ভালো গান কানে আসত। তখন আমি অনেকটাই ছোট। বন্যাদিকে তো চিনি না, সাদী মহম্মদকে তো নাই। দেখি একজন মহিলা কি দারুন দেখতে, কি সুন্দর করে শাড়ি পরেন, কেমন খঁজে খুঁজে শাড়ির সঙ্গে রঙ্গ মিলিয়ে সত্যি সত্যি ফুল লাগান মাথায়, ঘুরেফিরে গান গাইছেন। ভাবতাম সদাহাস্যজ্বল, শান্ত এই মানুষটিকে? যিনিই হোন নিশ্চই খুব মায়াবি, স্নেহপরায়ণা কেউ হবে। কিন্তু পশ্চিমবাংলার কোন এক গ্রামে বসে বন্যাদিকে চিনতে চাওয়া, কাছে যেতে চাওয়া স্বপ্ন তখন দুরন্ত। তাই সেসব ভাবনা স্কুলে পড়ার চাপে মন থেকে সরে গিয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যফল আর যাবে কোথায়! বড় হয়ে দিকভ্রান্তের মতন অনেক ঘুরে ঘুরে এসে পড়লাম সেখানেই যেখানে সেই ছোট্টবেলায় একদিন মন রেখে এসেছিলাম।

সেদিন কলামন্দিরের সেই অনুষ্ঠান আমায় আমূল বদলে দিল। বন্যাদির প্রগাঢ়তা আমার এত ভাবালো, এত কাঁদালো, এত বাকরুদ্ধ করল, যে আমি সেদিন সেইখানে বসেই স্থির করলাম আমি যেন একটিবার এই মনিষীকে শুরু হিসেবে পাই। কিভাবে? কি করে? তা আমি জানিনা। কিন্ত এই মানুষের জন্য আমি একলব্য হতে রাজি আছি। অবশ্য তখনও জানি না এই স্বপ্নাতীত, বরং যে সাহায্য মানুষ তার থেকে পেয়েছেন বা এখেনও পান তা লিখলে পাতা ভরে যাবে। বন্যাদি প্রচারবিমুখ নিশ্চই সেসব দেখলে রাগাও করবেন। কিন্তু ভক্তহৃয় কিছু জিনিস না বলে থাকতে পারেনা। ভক্ত হবার এটাই প্রথম নির্ণায়ক হয়ত। আর এসব কথা মুখে বলার সাহস তো আমার কোনোকালেই নেই। যেটুকু নড়বড়ে শক্তি তা এই কলামেই। তাই একটা ছোট ঘটনা লিখতে ইচ্ছে করছে এখন।

অনেকদিন আগে একবার সকালের একটি ঢাকার ফ্লাইটে চড়ে বন্যাদির মুম্বই যাওযার কথা। অনুষ্ঠান পঞ্চকন্যা পাঁচজনের শিবিরে একজন হলেন দিদি। দিদির সেদিন ঠান্ডা লেগে বেশ কাহিল অবস্থা। সেই কারণেই বােধহয় সেদিন উনি ফ্লাইটটি  মিস করেছেন। কলকাতা থেকে বিকেলের আরেকটি ফ্লাইট ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সময় কম বলে ফ্লাইট থেকে নেমেই ওঁকে সরাসরি মঞ্চে উঠতে হবে। নামার পর অনুষ্ঠানে পৌছানাের জন্য সময থাকবে বড় জোর দেড় ঘন্টা।

এই অঙ্কটা কষে রেখেছিলেন আমাদের সেই সহৃদয়া। কিন্তু বিধি বাম। বিকেলের সেই ফ্লাইটে একজন যাত্রী হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেই ফ্লাইটটি আধা ঘন্টা উড়ে আবার ল্যান্ড করেছে ঢাকাতেই। শারীরিক অসুস্থতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অধিকর্তারা ফ্লাইট নামিয়ে যথাযথ কাজই করেছেন এবং সেই ফ্লাইটেই চিকিৎসা হচ্ছে অসুস্থ ব্যক্তিটির। কিন্তু এতে দেরি হচ্ছে বন্যাদির বা অন্যান্য যাত্রীদের। অনুষ্ঠানের কমিটমেন্ট যে কত বড় সাঙ্ঘাতিক জিনিস সেটা যাঁরা অনুষ্ঠানের টিকিট কাটেন, যাঁরা অনুষ্ঠান আয়োজন করেন, যাঁরা গান গাইলেন তারা ছাড়া আর কারও পক্ষে বোঝা মুশকিল। ফ্লাইট দেরি হওয়াটা ভাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা এখানে। অথচ দিদির এতে খুব কিছু তোরজোড় নেই। কেন নেই সেটা একটু পরেই বাঝো যাবে।

কিন্তু সেই সুহৃদয়া এই অনুষ্ঠানের জন্য তাঁর সময়ের হিসেব যেহেতু কষা তাই তিনি এই ঘটনা বুঝতে পেরেছেন। এরপর আর আধা ঘন্টা দেরি হলে পঞ্চকন্যার অনুষ্ঠান চতুর্থকন্যা দিয়ে করতে হবে। ভাই কোনক্রমে ফ্লাইটের ম্যানেজারের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজের এবং কমিটমেন্টের গুরুত্ব বুঝিযে, অসুস্থ ব্যক্তিটিকে প্লেন থেকে নামিয়ে চিকিৎসা করার পরামর্শ দিয়ে প্লেনটি তিনি ছাড়ার ব্যবস্থা করেন। প্লেন ছেড়ে দেয় পনেরো মিনিটেই। মোটামুটি উনিশ-বিশ সময়ের হেরফেরে সঠিক জায়গায় পৌছানোর পর বন্যাদিকে এই পুরো বিষয়টি বলায় বন্যাদি খুশি  তো হলেনই না, উল্টো রেগে গিয়ে তাঁকে বলছিলেন, 'আমার বন্ধু হয়ে তুমি এত আনকাইন্ড হলে কিভাবে?’

আমি অবাক হয়ে গেছিলাম এই গল্প শুনে। আমি বারবার আশ্চর্য হই যখন দেখি একজন শিল্পীর কমিটমেন্ট গৌণ হয়ে যায় সেই মানুষটিরই মানবিকতার সামনে। অথচ এইটাই তা স্বাভাবিক। এমনই ভালো হওয়ার কথা ছিল আমাদের সকলেরই।

যৌনপল্লির শিশুদের জীবন গড়ার দায়ভার তো তার মতন আমাদেরও নেয়ার কথা ছিল। আমাদেরও কথা ছিল প্রয়োজনে যতটুকু পারি তাই দিয়ে অন্যের সহায় হওয়ার। আমরা বাই চয়েস নিইনি। উনি নিয়েছেন। উনি আসলে যা উচিত যা মানুষ হিসেবে স্বাভাবিক ভাই করেছেন। সেইজন্যই জীবন-মরণের কাছে তাঁর কমিটমেন্ট বরাবর গৌণ হয়ে রয়ে গিয়েছে। মানুষের জীবনের ছবিতে তাই শুধু ব্যাধির গানই নয়, আমার বিশ্বাস তাঁর মানবিকতার দৃষ্টান্তও কিছু থাকা উচিত।

কলকাতার কজন মানুষ বন্যাদির শিল্পী-বহির্ভূত মানব-মনন নিয়ে আগ্রহী জানিনা। কিন্তু যিনি এমন করে গাইলেন তাঁর জীবনের সবকিছু তো থাকবেই, এই কথা শুনে আমার এই অম্বেষণ। আর দেখুন তো ‘সোনালী-রূপালী-সবুজ-সুনীল' কত মায়াময় কথা গানে ভরা। শিল্পীর শিবকে আনতে গেলে পুরোপুরি শিল্পী মানুষটিকেও জানতে হয়। কেন তার গানে ঈশ্বর দর্শন হয়, কেন তার গানে প্রেম-বিরহের মেলবন্ধন হয়, কেন একই সুরে গাওযা অন্য দুজনের গান তার গাওয়া সুরের পাশে খেয় হারিয়ে ফেলে। এই 'কেন'র উত্তর খোঁজাটা খুব প্রযোজন। 'কেন' শব্দটা নিয়ে ভাবা শুধু বিজ্ঞানের নয়, আসলে সব মানুষেরই কাজ। আমি 'কেন' তা দেখার চেষ্টা করি। ভাই আমি হয়ত একটু কণামাত্র হলেও অনুধাবন করতে পারি। আমার বিশ্বাস, আমার মন বা এর চেয়েও ভালো করে অন্য অনেকেই তা পারেন। আর তা পারার পরে এমন একজন মানবীকে অ-সাধারণ ছাড়া আর কিছু ভাবা যায়না। সেইজন্যই আমার ভেতরের যে পৃথিবী তাকে সজীব করেন যিনি, যিনি আমার হৃদয়ের সব অলি-গলির লতাগুল্মে ফুল ফোটান, তাঁর গালের উদাসী হাওয়ায়।

সেখানকার যত মুকুল ঝরে আমি কুড়িয়ে নিই। সবটুকু অৰ্পণ করি এই মানুষটির চরণে। যিনি আমার চেতনায় সুগভীর পরশ করে আছেন। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। আমাদের সবার প্রিয় বন্যা দি।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ