ফিচার
  >
ব্যক্তিত্ব

মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর জন্মদিন আজ

নিউজজি ডেস্ক ১৭ জানুয়ারি , ২০২১, ১২:৩৬:৩২

  • ছবি : ইন্টারনেট থেকে

ঢাকা : আমি প্রজাপতির মতো উড়ি আর মৌমাছির মতো হুল ফোটাই’। তিনি তা করেও দেখিয়েছেন। গত শতাব্দীর সেরা একশ’ ক্রীড়া ব্যক্তিত্বের একজন মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী। এ কিংবদন্তি ১৯৪২ সালের ১৭ জানুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির লুইভিলাতে জন্মগ্রহণ করেন। তখন তার নাম ছিল ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে জুনিয়র। দুই ভাইয়ের বড় ক্লের নামকরণ পিতা ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে সিনিয়রের নামে করা হয়, যা একই নামের একজন উনবিংশ শতাব্দীর মার্কিন রাজনীতিবিদের সম্মানে রাখা হয়েছিল। বাবা ক্লে সিনিয়র ছিলেন রংমিস্ত্রি। তিনি সাইনবোর্ড ও বিলবোর্ড রং করতেন। মা ওডিসা গ্র্যাডি ক্লে ছিলেন একজন গৃহিণী। ক্লের দাদা ও দাদির নাম জন ক্লে ও সালি অ্যানা ক্লে। সিনিয়র ক্লে ছিলেন আফ্রিকান-আমেরিকান ক্রীতদাসের বংশধর। লুইভিলার পুলিশ অফিসার ও বক্সিং প্রশিক্ষক জো মার্টিন প্রথম ক্লেকে বক্সিং শিখতে বলেন। সেসময় তিনি বারো বছরের ক্লেকে এক সাইকেল চোরের সঙ্গে মারপিট করতে দেখেন। ক্লে ১২ বছর বয়সে প্রশিক্ষণ শুরু করেন।

ক্লে ১৯৫৪ সালে প্রথম অপেশাদার বক্সিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। তিনি ছয়বার কেন্টাকি গোল্ডেন গ্লাভস, দু’বার জাতীয় গোল্ডেন গ্লাভস উপাধি লাভ করেন। একবার লাভ করেন অ্যামেচার অ্যাথলেটিক ইউনিয়ন জাতীয় উপাধি। এরপর রোমে অনুষ্ঠিত ১৯৬০ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে বক্সিং প্রতিযোগিতায় লাইট হেভিওয়েট বিভাগে স্বর্ণপদক লাভ করেন।

১৯৬০ সালের ২৯ অক্টোবর পেশাদার বক্সিং প্রতিযোগিতায় ক্লে প্রথমবারের মতো অংশ নেন। ৬ রাউন্ডে পরাজিত করেন টানি হানসাকারকে। বাসন মাজা ও ঝাঁট দেয়ার মতো কাজ করতে রাজি না হয়ে ১৯৬০ সালে ক্লে তার প্রশিক্ষক আর্চি মুরকে ত্যাগ করেন। এরপর তিনি প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করেন অ্যাঞ্জেলো ডান্ডিকে। এরপর থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত ক্লে ১৯-০ জয়ের রেকর্ড করেন। এর মধ্যে ১৫টি জয় নকআউটের মাধ্যমে ঘটে। এ সময় তিনি টনি এস্পার্তি, জিম রবিনসন, ডনি ফ্লিম্যান, আলোঞ্জো জনসন, জর্জ লোগান, উইলি বেসমানফ, ল্যামার ক্লার্ক, ডগ জোন্স, হেনরি কুপার প্রমুখ মুষ্টিযোদ্ধাকে পরাজিত করেন। ১৯৬২ সালে আর্চি মুরকেও পরাজিত করেন তিনি।

১৯৬৪ সালে ২২ বছর বয়সে তিনি সনি লিস্টনকে পরাজিত করে বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নেন। শিরোপা জয় করে খ্যাতির শিখরে দ্রুত পৌঁছে যান তিনি। এর কয়েকদিন পর তিনি নেশন অব মুসলিমে যোগ দেন। তার নাম রাখা হয় ক্যাসিয়াস এক্স। কারণ তিনি মনে করতেন তার পদবি দাসত্বের পরিচায়ক। এর কিছুদিন পর নেশন অব মুসলিমের প্রধান সাংবাদিকদের সামনে তাকে মোহাম্মদ আলী বলে পরিচয় করিয়ে দেন।

আলী ১৯৬৬ সালে ক্লিভলান্ড উইলিয়ামসের সঙ্গে লড়াই করেন। এটি তার সেরা ম্যাচগুলোর একটি। এ ম্যাচে তিনি ৩ রাউন্ডে জেতেন। ১৯৬৭ সালে তিনি হিউস্টনের একটি রিংয়ে এরনি তেরেলের সঙ্গে লড়াইয়ে নামেন। তেরেল তাকে ম্যাচের আগে ক্লে বলে অপমান করেন। আলী তাকে উপযুক্ত জবাব দেয়ার মনস্থির করেন। ১৫ রাউন্ডের এ লড়াইয়ে তিনি তাকে রক্তাক্ত করেন। অনেকে মনে করেন, আলী ইচ্ছা করেই লড়াই আগে শেষ করেননি।

নির্বাচনী পরীক্ষায় পাস করতে না পারায় ১৯৬৪ সালে তিনি সৈনিক জীবনে প্রবেশ করতে পারেননি। ১৯৬৬ সালে তিনি উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৭ সালে তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেন এবং যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানান। এর কয়েকদিন পর তাকে দোষী সাব্যস্ত করে বক্সিং উপাধি কেড়ে নেয়া হয়। তিনি তার জীবনের সেরা সময়ে পরবর্তী চার বছর কোনো ধরনের বক্সিং প্রতিযোগিতায় নামতে পারেননি। ১৯৭১ সালে তার আপিল সুপ্রিম কোর্টে পেশ করা হলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নেয়া হয়।

মার্চ ১৯৭১ সালে আলী জো ফ্রেজিয়ারের মুখোমুখি হন যা ‘শতাব্দীর সেরা লড়াই’ হিসেবে পরিচিত। বহুল আলোচিত এ লড়াইটি ছিল দুই মহাবীরের লড়াই- যা সবাইকে শিহরিত করে। জো ফ্রেজিয়ার খেলায় জয়লাভ করেন। আলী প্রথমবারের মতো পরাজিত হন। অবশ্য ১৯৭৪ সালের ফিরতি লড়াইয়ে তিনি শিরোপা পুনরুদ্ধার করেন।

তিনি ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে জর্জ ফোরম্যানের সঙ্গে লড়াইয়ে নামেন, যা রাম্বেল ইন দ্যা জাংগল বলে পরিচিত। আলীর ঘোর সমর্থকরাও এতে তার জেতার সম্ভাবনা দেখেননি। সবাই ভেবেছিলেন তিনি ক্ষিপ্রতার সঙ্গে লড়াই করবেন। কিন্তু তিনি দূরে দূরে থাকতে লাগলেন। ফোরম্যানকে আক্রমণ করার সুযোগ দিলেন। উদ্দেশ্য ছিল তাকে ক্লান্ত করে দেয়া। ৮ম রাউন্ডে তিনি তার সুযোগ পেয়ে গেলেন এবং ফোরম্যানকে নকআউট করলেন।

১৯৭৫ সালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এজন্য ভূমিকা রাখেন নেশন অব মুসলিমের প্রধান ডব্ল– ডি মোহাম্মদ। ১৯৭৫ সালে আলী লড়াই করেন ফ্রেজিয়ারের সঙ্গে। দু’জন বীরের এ লড়াইয়ের জন্য সবাই খুবই উত্তেজিত ছিলেন। ১৪ রাউন্ডের শেষে ফ্রেজিয়ারের কোচ তাকে আর লড়াই করতে দেননি। কারণ তার এক চোখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এর কিছুদিন পরই ফ্রেজিয়ার অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালে আলী ১৯৭৬-এর অলিম্পিক মেডালিস্ট লিয়ন স্পিংক্সের কাছে খেতাব হারান। তিনিই প্রথম যিনি একজন অপেশাদারের কাছে হেরেছিলেন। ১৯৭৯ তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

তিনি ১৯৮০ সালে আবার ফিরে আসেন ল্যারি হোমসের কাছ থেকে শিরোপা ছিনিয়ে নিতে। ল্যারি ছিলেন তারই শিষ্য। তাই সবাই লড়াইটি নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। ১১ রাউন্ড পর আলী পরাজিত হন। পরে জানা যায় মস্তিষ্কে মারাত্মক ত্রুটি ধরা পড়েছে। তার মস্তিষ্ক ফুটো হয়ে গিয়েছিল। পরে তিনি ১৯৮১ সালে পুরোপুরি অবসর গ্রহণ করেন।

মোট ৬১টি লড়াইয়ের মধ্যে ৫৬টিতেই জিতেছেন তিনি। এর মধ্যে ৩৭টি লড়াইয়ে জিতেছেন প্রতিপক্ষকে নকআউট করে। হেরেছেন মাত্র ৫ বার।

৩ বার হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন শিরোপা জয়কারী বক্সিং ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড়। ১৯৬০ সালে রোম অলিম্পিকের লাইট-হেভিওয়েট স্বর্ণপদক বিজয়ী।

১৯৭৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তিনি ৫ দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন। সফরসঙ্গী ছিলেন তার দ্বিতীয় স্ত্রী ওই সময়ের বিখ্যাত মডেল ভেরোনিকা পরশে, মেয়ে লায়লা আলী, ভাই, বাবা ও মা। কিংবদন্তি বক্সার মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে একই রিংয়ে নেমেছিলেন প্রথম আন্তর্জাতিক পদকপ্রাপ্ত বাংলাদেশের মুষ্ঠিযোদ্ধা আবদুল হালিম । সেদিন আবদুল হালিমকে নকআউট করেননি তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন মোহাম্মদ আলী। তিনি আরও ছোট কাউকে চেয়েছিলেন তার সঙ্গে মজা করার জন্য। তখন বাংলাদেশের জুনিয়র বক্সিং চ্যাম্পিয়ন ১২ বছর বয়সী গিয়াস উদ্দিন তার সঙ্গে বক্সিং খেলার সুযোগ পান। সেই সফরে বাংলাদেশ সরকার তাকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করে। পল্টনের বক্সিং স্টেডিয়ামের নাম তার নামে রাখা হয়।

১৯৮০ সালে তিনি পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হন। এ রোগের জন্য বক্সিং দায়ী কিনা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, বক্সিং না করলে এত বিখ্যাত হতেন না। অবসরের পর তিনি মানবতার কল্যাণে কাজ করেছিলেন। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। ৩২ বছর পারকিনসন্স রোগে ভোগার পর ৩ জুন ২০১৬-তে ৭৪ বছর বয়সে মারা যান তিনি। রেখে যান ৭ মেয়ে ও ২ ছেলে। ৪ বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। আলী নিজের ক্যারিয়ার বিষয়ে ‘দ্য গ্রেটেস্ট : মাই ওন স্টোরি’ এবং নিজের জীবনী ‘দ্য সোল অব অ্যা বাটারফ্লাই’সহ আরও কিছু বইও লিখে গেছেন।

মোহাম্মদ আলীর কয়েকটি সেরা উক্তি

**     বাংলাদেশ প্রসঙ্গে : ‘যদি স্বর্গ দেখতে চাও, তাহলে বাংলাদেশে এসো’।

**     অসম্ভব হচ্ছে সম্ভাবনা। অসম্ভব হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী। অসম্ভব বলে কিছু নেই।

**     ইচ্ছাশক্তি অবশ্যই দক্ষতার চেয়ে শক্তিশালী।

**     আপনার সামনে কোনো পাহাড় নেই, যেটা আপনাকে থামিয়ে দিয়েছে। এটা আসলে আপনার জুতার মধ্যে থাকা নুড়ি পাথর।

**     যখন আপনার মাথায় ভালো কোনো উত্তর আসবে না, তখন নীরব থাকাটাই ভালো।

**     যদি আমার মাথা ভাবতে পারে, মন বিশ্বাস করে, তাহলে আমি পারবই।

**     তুমি ২০ বছরে যেভাবে পৃথিবীটাকে দেখতে, যদি ৫০ বছরেও সেভাবেই দেখ, তাহলে জীবনের ৩০ বছর তুমি নষ্ট করেছ।

**     যার কল্পনা নেই, তার ভর করে ওড়ার ডানাও নেই।

**     আমি সেরা নই, আমি দ্বিগুণ সেরা।

**     প্রতিদিন এমনভাবে বাঁচো যেন সেটাই তোমার জীবনের শেষ দিন।

**     স্বপ্ন সফল করার সবচেয়ে ভালো উপায় হল জেগে ওঠা।

**     দিন গুনবে না, বরং দিনকে গুনতে দাও।

**     ঝুঁকি নেয়ার মতো সাহস যার নেই সে জীবনে কিছুই করতে পারে না।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers