ফিচার
  >
ব্যক্তিত্ব

মুহম্মদ খসরু: দেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের নিবেদিত পথিকৃৎ

নিউজজি প্রতিবেদক ১৯ ফেব্রুয়ারি , ২০২১, ১৩:১৮:১০

  • মুহম্মদ খসরু: দেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের নিবেদিত পথিকৃৎ

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনে যারা সম্মুখযোদ্ধা, তাদের একজন মুহম্মদ খসরু। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি চলচ্চিত্র ভুবনে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। তাকে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কখনো লেখক হিসেবে, কখনো সম্পাদক হিসেবে আবার কখনো একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে চলচ্চিত্রের জন্য লড়াই করে গিয়েছেন তিনি।

আজ ১৯ ফেব্রুয়ারি মুহম্মদ খসরুর চলে যাওয়ার দিন। ২০১৯ সালের এই দিনে তিনি পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। প্রয়াণ দিনে এই গুণী মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা।

মুহম্মদ খসরুর জন্ম ভারতের হুগলী জেলায়। তবে তার পৈত্রিকবাড়ী ঢাকার কেরানীগঞ্জের রুহিতপুরের মোহনপুর গ্রামে। তার বাবা ছিলেন হুগলী জুট মিলের কর্মকর্তা। সেই সূত্রেই তারা থাকতেন হুগলীতে। কিন্তু সেখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে ৫০-এর দশকে তারা ঢাকায় চলে আসেন। সেই থেকে খসরু ঢাকায় থাকতেন। জীবনের বেশীরভাগ সময় ঢাকায় কাটালেও নিভৃতচারী স্বভাবের এই মানুষটি শেষ জীবনে বসবাস করেছেন তার পৈত্রিকনিবাস মোহনপুর গ্রামে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার (বিসিক) নকশা কেন্দ্রে আলোকচিত্রী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মুহম্মদ খসরু। তারপর ধীরে ধীরে তিনি চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’-এর প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন খসরু।

১৯৬৮ সাল থেকে চলচ্চিত্র বিষয়ক বিখ্যাত পত্রিকা ‘ধ্রুপদি’ সম্পাদনা শুরু করেন মুহম্মদ খসরু। পরবর্তীতে তিনি চলচ্চিত্র বিষয়ক আরও একটি পত্রিকা ‘চলচ্চিত্র’ সম্পাদনা করেছেন। খসরু বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ ও জাতীয় ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইন্সটিটিউটের প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করেন। ১৯৭৫ সালে ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনার ‘পালঙ্ক’ ছবিটিতে খসরু ভারতীয় চলচ্চিত্রকার শ্রী রাজেন তরফদারের সাথে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন।

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি নির্মাণ শুরু করার পেছেনেও মুহম্মদ খসরুর অবদান রয়েছে। কেরালার চিত্রলেখা এবং ওডেসা ফিল্ম কো-অপারেটিভের অনুপ্রেরণায় বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে যে ফিল্ম কো-অপারেটিভ গঠিত হয়েছিলো, তার মাধ্যমে এই দেশে সর্বপ্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি নির্মাণ শুরু হয়। সেই পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন খসরু।

মুহম্মদ খসরু সম্পর্কে তাঁর জীবদ্দশায় কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান ফিল্মফ্রিতে লিখেন- ‘মুহম্মদ খসরুকে যারা ব্যক্তিগতভাবে চেনেন, তারা জানেন যে, মানুষ হিসেবে তিনি ক্ষেপাটে, রাগী, মুখে তার অবিরাম খিস্তি। তার সব রাগ, ক্ষোভ ঐ চলচ্চিত্রকে ঘিরেই, -এই মানুষ বেঁচে আছেন সংসার করবার জন্য নয়, সম্পদ অর্জনের জন্য নয়, খ্যাতি কুড়াবার জন্য নয়, শুধুমাত্র একটি শিল্পমাধ্যমকে ভালোবাসবার এবং সে ভালোবাসা অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দেবার জন্য।’

মুহম্মদ খসরু চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন দীর্ঘ দিন ধরে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারেননি। হাসান আজিজুল হক রচিত ‘নামহীন গোত্রহীন’ অবলম্বনে একটি চিত্রনাট্যও তিনি তৈরি করেছিলেন। কিন্তু কোনো প্রযোজক না পাওয়ায় সেটি আলোর মুখ দেখেনি। রাষ্ট্রীয় অনুদানের জন্য পাণ্ডুলিপিটি দু’বার জমাও দিয়েছেন কিন্তু অনুদান মেলেনি। অর্থাভাবে নির্মাণ করতে পারেননি তাঁর বহুল প্রতীক্ষিত ‘নামহীন গোত্রহীন’।

মুহম্মদ খসরু চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহীদের প্রচুর অনুপ্রেরণা দিতেন। বিভিন্ন চলচ্চিত্রের বিষয়াদি খিস্তিও করতেন তিনি। তবুও সিরিয়াস চলচ্চিত্রের বিষয়ে আগ্রহী মানুষজন তাকে ঘিরে তৎপর ছিলেন বহুকাল। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের এই প্রবাদতুল্য মানুষটি উৎসাহিত করেছেন দেশের খ্যাতনামা অনেক চলচ্চিত্রকারদের।

তার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন চলচ্চিত্রের ফেরিওয়ালা তারেক মাসুদও। এভাবে তিনি তার কর্মময় সময়ে হয়ে ওঠেন যাপনে-চিন্তায় বহু মানুষের প্রেরণা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পরে চল‌চ্চিত্র সংসদ আন্দোলন থেকে আলাদা হয়ে নিজেদের মত কাজ করেছেন। তাদের সবার নিজেদের সেই সিনেমা বানানোর চেষ্টা এখন ‘বিকল্পধারা’ হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংস্কৃতির বিকাশে নিরবচ্ছিন্ন অবদানের জন্য মুহম্মদ খসরু হীরালাল সেন আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন। পাশাপাশি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘সুবর্ণ জয়ন্তী পদক’ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ কর্তৃক ‘আজীবন সম্মাননা ২০১৭’ লাভ করেন।

 

 

নিউজজি/ এসএফ/কেআই

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers