ফিচার
  >
ভ্রমণ

পোখারা ভ্রমণের ১৪ আনাই ছিল ব্যর্থ

জাকিয়া নূর মিতু ১২ জানুয়ারি , ২০২১, ১৮:২৯:০২

  • ছবি: লেখক

নেপালের পোখারায় যারা ঘুরতে যান তাদের ভ্রমণের সফলতা নির্ভর করে অন্নপূর্ণা আর ফিশটেইলের চূড়া কতখানি দেখতে পেরেছেন তার ওপর। আর সেই হিসেবে ২০১৬ সালে আমার পোখারা ভ্রমণের ১৪ আনাই ছিল ব্যর্থ।

২২ সেপ্টেম্বরে পোখারা পৌঁছেছিলাম। বর্ষা তখনও বিদায় নেয়নি। সন্ধ্যায় ঝুম বৃষ্টি আর সকালে ধুয়ে যাওয়া ঝকঝকে রোদ্দুর। পরদিন ভোর ৪টায় উঠে সারাংকোটে যেতে হবে। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি।  সারাংকোটে গিয়ে প্রচণ্ড উত্তেজনা নিয়ে বসে থাকলাম। দেবী অন্নপূর্ণা আর ফিশটেইল মেঘের ফাঁকে সামান্য উঁকি দিয়ে মিলিয়ে গেল। সেই সামান্য দর্শনেই পুরোটা দর্শনের আকাঙ্ক্ষা অসামান্য হয়ে উঠল।

ঠিক করলাম পরদিন আবার যাব। যথারীতি ভোর ৪টা থেকে তীর্থের কাকের মতো সারাংকোটে গিয়ে বসে রইলাম। কিন্তু মেঘগুলোকে যেন হিমালয়ের উপরেই গিয়ে জড়ো হতে হবে। পুরো আকাশ পরিষ্কার। শুধু চূড়াগুলো মেঘে ঢাকা। অন্নপূর্ণা সেদিন ছিলেন একেবারেই নারাজ। কিছুতেই মেঘের ঘোমটা সরাবেন না। সারাদিন বুকে একটা চাপা ব্যথা নিয়ে ঘোরাঘুরি করলাম। চূড়া দেখতে না পারায় এতটাই বিমর্ষ ছিলাম যে বিদায়ী বর্ষা যে সবকিছু ধুয়েমুছে সবুজ করে সাজিয়ে রেখেছিল সেদিকটা নজরেই আসে নাই। অন্নপূর্ণা হিমালয়ের দশম উচ্চতম শৃঙ্গ আর ফিশটেইল সবচাইতে দর্শনীয় শৃঙ্গ।

সারাংকোট থেকে ফিরে এসে সকালে নাস্তার পর গেলাম ডেভিস ফল দেখতে। ভীষণ বেগে স্বেতী নদীর পানির স্রোতধারা বয়ে এসে আছড়ে পড়ছিল অনেক গভীরে এক টানেলের ভিতর। আর সেই আছড়ে পড়া পানিতে সূর্যালোক এসে তৈরি করছিল রংধনু। এই ঝর্ণাকে ঘিরে একটা মিথ আছে। ডেভিড নামে এক সুইস নাগরিক তার স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াতে আসে। আর এক দুর্ঘটনায় একেবারে টানেলে পড়ে মারা যান। তাই এর নাম ডেভিস ফল।

তারপর আমরা গেলাম জাপানিজ পিস প্যাগোডা দেখতে। প্রায় পাঁচশত ধাপ সিঁড়ি বেয়ে প্যাগোডায় পৌঁছাতে হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানকে প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হয়েছিলো।  তার নিদর্শন স্বরূপ বিভিন্ন দেশে এই পিস প্যাগোডা জাপান সরকারের অর্থায়নে তৈরী করা হয়।সাদা ধবধবে প্যাগোডাটি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৬০০ ফুট উচু পাহাড়ে স্থাপিত।ওখান থেকে পোখারা ভ্যালী এবং ফেওয়া লেক পুরোটা দেখা যায়।

পোখারা যেদিন এসেছি সেদিনই ফেওয়া লেকে বোট রাইডিং করেছিলাম। কী ভীষণ সুন্দর একটা লেক! চারপাশ পাহাড়ে ঘেরা। টলটলে পানি আর মাঝখানে একটা দ্বীপের মতো স্থানে একটা মন্দির। নেপালে আসার আগে ফেওয়া লেকের গল্প অনেকের কাছে শুনেছি। কিন্তু ওখানে যাবার পর আরো দুটো লেকের নাম শুনলাম। পিস প্যাগোডা থেকে চলে গেলাম সেই দুই লেকের কাছে। এরা হোল বেগনাস লেক আর রুপা লেক। স্থানীয়রা বলে এরা নাকি দুই বোন। দুটো লেকের মাঝখান দিয়ে রাস্তা চলে গেছে। আমরা ওয়াচ টাওয়ার থেকে দুটো লেকের দৃশ্য একসাথে দেখতে পাচ্ছিলাম। বেগনাস লেকের একপাশে ছোট একটা গ্রাম। দেখে ওয়ার্ডসওয়ার্থ এর ‘দ্য সলিটারি রিপার’-এর কথা মনে হচ্ছিল। বেগনাস আর রুপা লেকের এই সৌন্দর্য সবসময় এ রকম থাকে না। এই রূপ কেবল বর্ষায় এলে দেখা যায়।

বেগনাস লেকের পাশে একটা ছোট কুঁড়েঘরে দুই বুড়োবুড়ি বাস করেন। ওরা এখানে আসা টুরিস্টদের জন্য রান্না করেন। দুপুরে খেতে চাইলে ওদের আধ ঘণ্টা আগে জানাতে হয়। আমরা বলার পর মহিলা বাগান থেকে কুমড়ো শাক তুলে চুলায় বসালেন। আর বরফে রাখা লেকের মাছ তুলে ভাজতে বসলেন। সাথে ফুলকপি আর আলু দিয়ে সবজি। সব দিয়ে থালি সাজিয়ে দিলো। মনে হচ্ছিলো অমৃত খাচ্ছি।

হোটেলের রুমে ফিরে সবাই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমি শুয়ে রেস্ট নিচ্ছিলাম। ঘুম আসছিল না। আজকেই শেষদিন। কাল সকালের বাসে ফিরে যাব কাঠমুন্ডু। হঠাৎ জানালায় চোখ পড়তে দেখি ফিসটেইলের চূড়াটা দেখা যাচ্ছে আর তার উপর শেষ বিকেলের সূর্যের আলো এসে পড়ে পুরো সোনালি রং ধারণ করেছে। দৌড়ে মোবাইল নিয়ে জানালার কাছে গেলাম। ততক্ষণে মোবাইলের চার্জ শেষ। কাউকে ডাকলাম না। ছবি তোলারও চেষ্টা করলাম না। শুধু মুগ্ধ হয়ে দেখলাম শেষ বিকেলের আলো এসে কী করে চূড়াটাকে সোনালি মুকুট পরিয়ে দিলো।

শোনা যায়, শরৎকাল হিমালয় দেখার জন্য উপযুক্ত সময়। আমরা গিয়েছিলাম শেষ বর্ষায়। তারপর থেকে অপেক্ষায় আছি কোনো এক শরতে আবার যাব অন্নপূর্ণা দর্শনে। আর সেই অপেক্ষায় একটা কবিতাও লিখেছি-

To the Autumn

Not the Autumn

Destroyer and preserver,

Not of fruitfulness and color,

I weep in the Autumn

When hours of wait

Fail to touch desire.

Removing the veil of clouds,

He will appear in the bluest sky.

Dear Season, let me be the witness,

I promise, I will not blink my eyes.

The sun will throw the golden rays,

And he will wear a golden crown.

Oh season, let me watch him,

And wish him at his throne.

He is the peak of all peaks,

And will be the king of all kings.

Let me write a lyric for him,

To worship, I will sing.

I promise, I will not desire

To touch and to kiss.

Oh Autumn, let me only have

The moment and touch the bliss.

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও ট্রাভেলার

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers