জীবনযাত্রা
  >
স্বাস্থ্য

ইউরিক এসিড কি এবং এটি ঠেকানোর উপায়

নিউজজি ডেস্ক ২৫ মার্চ , ২০২১, ১৪:৪৩:৪৯

  • ছবি: ইন্টারনেট

ঢাকা: আমাদের শরীরে কোষের মধ্যে ডিএনএ আছে। ডিএনএ-র মধ্যে আবার পিউরিন নিউক্লিওটাইড থাকে। আবার যে খাদ্যদ্রব্য আমরা খাই, তার থেকেও পিউরিন পাওয়া যায়। এই কোষের মধ্যে থাকা পিউরিনের ভাঙনের ফলে শেষ উৎপাদন বা এন্ড প্রোডাক্ট হিসেবে ইউরিক অ্যাসিড তৈরি হয়। এই ইউরিক অ্যাসিড রক্তে চলে যায় এবং কিডনির মাধ্যমে বর্জ্য পদার্থ হিসেবে প্রস্রাবের সঙ্গে দেহ থেকে বের হয়ে যায়।রক্তে যদি ইউরিক এসিডের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি পায় এই অবস্থাকে বলা হয় হাইপারইউরিসেমিয়া।

ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারন

ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়াটাকে মেটাবলিক সিনড্রোমের অংশ বলা হয়। তাই উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চমাত্রায় কোলেস্টেরল-ট্রাইগ্লিসারাইড এবং ডায়াবেটিস থাকলে ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। তার উপরে যদি নিকট আত্মীয়দের কারও এই সমস্যা বা কিডনি স্টোন, গাউটের সমস্যা থাকে, তাহলে সেই রোগীর ইউরিক অ্যাসিড জনিত সমস্যা অধিক মাত্রায় হতে দেখা যায়।

আবার জীবন শৈলী সংক্রান্ত সমস্যা থেকে ইউরিক অ্যাসিডের আশঙ্কা থাকে। সে জন্য লিপিড প্রোফাইল হাই থাকলে ইউরিক অ্যাসিড টেস্ট করে বহু ক্ষেত্রে ইউরিক অ্যাসিডও বেশি পাওয়া যায়। যদি কারও ক্ষেত্রে রক্তে সুগার, কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইডের হার বেশি থাকলেও ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ কম থাকে, তাহলেও ১/২ বছর অন্তর ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা পরীক্ষা করানো বাঞ্ছনীয়।

স্বাভাবিক অবস্থায় নারীদের ক্ষেত্রে রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা হলো ২.৪ থেকে ৬.০ মিলিগ্রাম পার ডিএল এবং পুরুষের ক্ষেত্রে ৩.৪ থেকে ৭.০ মিলিগ্রাম পার ডিএল

ইউরিক অ্যাসিড থেকে শরীরে কী কী সমস্যা তৈরি হয়

ইউরিক এসিড বেড়ে গেলে দেহের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অংগ বিশেষ করে কিডনির উপরে দীর্ঘদিন জমলে রেনাল স্টোন হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। ফলে কিডনি ঠিক মত কাজ করে না এবং মুত্রের মাধ্যমে ইউরিক এসিড ও অন্যান্য বর্জ্য শরীর থেকে বের হতে পারে না। কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্ট হয় এবং কিডনি ড্যামেজ ও হয়। এছাড়াও আরো যে সব সমস্যা দেখা দিতে পারে:

  • ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বৃদ্ধির ফলে অ্যাকিউট ইউরিক অ্যাসিড আরথারাইটিস হতে পারে। যাকে গাউট বলা হয়। এতে বুড়ো আঙুলের গোড়া লাল হয়ে ফুলে যায়, প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয়। এমনকী জ্বর এসে যেতে পারে। হাঁটু, গোড়ালি এবং পায়ের ছোট অস্থিসন্ধি, হাত, কনুই থেকে শুরু করে কবজি, আঙুলের গাঁটে গাঁটে ব্যথা হতে পারে। চাপ পড়লেই ব্যথা বেড়ে যায়। তাই এই সময় বরফ সেঁক এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে বলা হয় ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি।
  • এছাড়াও ইউরেট নেফ্রোপ্যাথি হতে পারে। এতে ইউরিক অ্যাসিড ক্রিস্টালের মতো হয়ে কিডনিতে জমে গিয়ে ইউরিয়া-ক্রিয়েটিনিন বাড়িয়ে দেয়। এর আবার দুটি ধরন। ক্রনিক ইউরেট নেফ্রোপ্যাথি এবং অ্যাকিউট ইউরেট নেফ্রোপ্যাথি।
  • অ্যাকিউট ইউরেট নেফ্রোপ্যাথি সাধারণত ব্লাড ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যেতে পারে। তখন সেক্ষেত্রে প্রস্রাবের গতি এবং কিডনির সুস্থতা ঠিক রাখতে ক্যানসারের চিকিৎসা শুরুর আগে ইউরিক অ্যাসিডের পরীক্ষা করে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা কমিয়ে রাখার ওষুধ (অ্যালোপিউরিনল জাতীয়) দেওয়া হয়। এর সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণে ইনট্রাভেনাস ফ্লুইড দেওয়া হয়।
  • ইউরিক অ্যাসিড থেকে এছাড়া কিডনিতে স্টোনও হতে পারে। এটা ইউরেটার বা ব্লাডারে নেমে এসে প্রস্রাবের গতিরোধ, রক্তক্ষরণ করতে পারে।

যেসব খাবার পরিহার করা উচিত

  • অর্গান মিট অর্থাৎ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জাতীয় মাংস যেমন- কলিজা, মগজ, জিহ্বা, ফুসফুস, কিডনি ইত্যাদি খাওয়া যাবে না। কারণ এগুলো ইউরিক এসিড বাড়ায়।
  • অধিক চর্বিযুক্ত গরুর মাংস, খাসির মাংস, ভেড়ার মাংস বা মহিষের মাংস খাওয়া যাবে না। কারণ এসব খাবারে ইউরিক এসিডের মাত্রা অধিক। এসব মাংস যদি খেতে চান তাহলে একেবারে চর্বি ছাড়া মাংস অল্প করে খাবেন।
  • সামুদ্রিক মাছ এবং শক্ত খোসাযুক্ত প্রাণী যেমন- চিংড়ি, শামুক, কাঁকড়া ইত্যাদি খাবার এড়িয়ে চলুন।
  • সব রকমের ডাল, মটরশুটি, সিমের বিচি, কাঁঠালের বিচি ইত্যাদি খাওয়া পরিহার করতে হবে।
  • মধু, চিনির সিরাপ, চিনিযুক্ত পানীয়, বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত ফলের জুস, কোমল পানীয় একেবারেই খাওয়া যাবেনা।
  • কিছু কিছু শাকসবজি যেমন- পালংশাক, পুঁইশাক, ব্রকোলি, ফুলকপি এড়িয়ে চলুন। এছাড়া মাশরুমও খাওয়া যাবে না।
  • চিনিযুক্ত পানীয়, অ্যালকোহোল এবং ক্যাফেন জাতীয় পানীয় খাওয়া যাবে না।

যেসব খাবার খাওয়া উচিত

  • অধিক আঁশযুক্ত খাবার যেমন- সবুজ শাকসবজি এবং ফলমূল। এই আঁশযুক্ত খাবার শরীর থেকে ইউরিক এসিড মল আকারে বের করে দেয়।
  • চর্বিহীন মাংস খেতে হবে। এ ক্ষেত্রে মুরগির মাংস উত্তম। তবে চামড়া এবং পাখনা খাওয়া যাবে না। কারণ এতে প্রচুর চর্বি থাকে। তাছাড়া পরিমাণ মতো মাছ এবং কুসুম ছাড়া ডিম খাওয়া যাবে। ফ্যাট ছাড়া দুধ বা স্কিম মিল্কও খেতে পারবেন।
  • বেশি বেশি টক ফল বা ভিটামিন-সি জাতীয় খাবার খেতে হবে। গ্রিন টি ইউরিক এসিড কমাতে সহায়তা করে। তাই ইউরিক এসিড কমাতে নিয়মিত গ্রিন টি পান করতে পারেন।
  • চাহিদার তুলনায় বেশি পরিমাণ পানি পান করতে হবে। প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন লিটার পানি পান করবেন। পানি দেহের যে কোনো ধরনের বিষকে দূর করতে সহায়তা করে। এ ক্ষেত্রে ইউরিক এসিড নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পানি।

ইউরিক অ্যাসিডের চিকিৎসা কীভাবে করা হয়

ট্যামসোলোসিন জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয় ইউরেটারিক স্টোন থেকে হওয়া ক্রনিক ব্যথার সমস্যায়।

৬ মিলিমিটারের থেকে ছোট স্টোন হলে সেটা স্বাভাবিকভাবেই বের হয়ে যায়। না হলে ইউরোলজিস্টের মতামত নিতে বলা হয়। প্রস্রাবে সংক্রমণ থাকলে দেওয়া হয় অ্যান্টিবায়োটিক। গাউট হলে নির্দিষ্ট ওষুধ, অ্যান্টাসিড সহ পেনকিলার দেওয়া হলেও বরফ সেঁক, পা উপরে তুলে রাখতে হবে এবং বিশ্রামের পরামর্শ দেওয়া হয়। এই সময় আগে এইভাবে অস্থিসন্ধির ব্যথা কমিয়ে তারপর অ্যালোপিউরিনল, ফ্যাবুক্সোস্ট্যাট জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়। তবে কিছু ওষুধ থেকে আবার সমস্যা হতে পারে।

ইউরিক অ্যাসিডের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে

অবশ্যই। ইউরিক অ্যাসিডের চিকিৎসায় কোনও রোগীকে কোন ওষুধ দেওয়া যাবে, ভালো করে পরীক্ষা করে তবেই দেওয়া হয়। অ্যালোপিউরিনল থেকে ত্বকে র‌্যাশ ফোস্কা জাতীয় সমস্যা হতে পারে। এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে বাড়াবাড়ি এতটাই হতে পারে যে রোগী স্টিভেন জনসন সিনড্রোম হয়ে মারাও যেতে পারে। আবার ফ্যাবুক্সোস্ট্যাট থেকে ইসকিমিক হার্ট এবং ইসকিমিক ব্রেন ডিজিজের একটা আশঙ্কা করা হয়। ফলে সবাইকে সব ওষুধ দেওয়া যায় না বলে রোগীর সমস্যা বুঝে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ওষুধ দেন। রোগীর অবস্থা, পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসক চিকিৎসা কী করা হবে, ঠিক করে নেন।

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers