অন্যান্য
  >
একুশে বইমেলা

সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হলো লেখালেখি : জয়শ্রী দাস

নিউজজি প্রতিবেদক ৪ এপ্রিল , ২০২১, ১৮:৪৩:১৬

  • ছবি : নিউজজি

জয়শ্রী দাস। একজন কথাসাহিত্যিক। ছোটবেলায় বই পড়তে পড়তেই একসময় নিজের ভেতর থেকে লেখার তাড়া চলে আসে তার। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ম্যাগাজিনে লেখা প্রকাশ হতে থাকে। জয়শ্রী দাস গল্প-উপন্যাস লিখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তিনি সমাজ সচেতনমূলক বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে কলাম লিখছেন এবং গবেষণার কাজ করছেন। শৈশব থেকেই জয়শ্রী দাস মেধার পরিচয় দিয়ে আসছেন। পটুয়াখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও এ কে এম কলেজ পটুয়াখালী থেকে এইচএসসি পাস করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এ ছাড়াও, তিনি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল গবেষণায় নিয়োজিত।

জয়শ্রী দাস পেশাগত জীবনে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনে (বিএসটিআই) উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত।

জয়শ্রী দাস তার নিরন্তর সাহিত্য সাধনায় ইতোমধ্যে নির্মাণ করেছেন নিজস্ব এক শিল্পভুবন। মানুষকে জাগ্রত করেন তার লেখা দিয়ে। তিনি স্বপ্ন দেখেন রাগবিহীন একটা পৃথিবী দেখতে। যেখানে সবাই পরস্পরের শুধুই প্রশংসা করবে। মানুষ মানুষের জন্য মঙ্গল কামনা করবে। মানবিক সম্পর্কের এই দুর্দিনে সচেতনতা বোধ তৈরি করতে তিনি লেখার ভেতর তা তুলে ধরেন। পাঠক সমাজে একজন হলেও যদি সচেতন হন তাহলেই তার শিল্পভুবন সার্থক।

প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালের একুশের বইমেলায়। উপন্যাসটির নাম ‘একটু অন্যরকম গল্প, ২০১৯ সালে ‘সে এবং দ্বিতীয়’, ২০২০ সালে ‘সদয় অবগতি’। এবারের করোনাকালীন বইমেলায় চতুর্থ উপন্যাস ‘তুমি আছো কবিতা নেই’ প্রকাশ হয়েছে।

তিনি নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় অনলাইন পোর্টাল নিউজজির সঙ্গে। সেসব কথা নিচে তুলে ধরা হলো-

নিউজজি : এবারের বইমেলায় আপনার চতুর্থ নতুন উপন্যাস ‘তুমি আছো কবিতা নেই’ সম্পর্কে কিছু বলুন?

জয়শ্রী দাস : এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কবিতা। মাত্র ১৯ বছর বয়সী কবিতা তীব্র অভাবের কষ্ট বুকে নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার জন্য রেললাইন, বাসস্ট্যান্ড ও বিভিন্ন অলিগলিতে ভিক্ষাপাত্রটি নিজ হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয় কবিতা। ঋতু পরিবর্তনে প্রকৃতির পরিবর্তন আসে। সেই পরিবর্তনের ধারায় ধরা দেয় কবিতার হৃদয়ে। সে খুঁজে পায় রায়হানকে। কবিতার সংগ্রামী জীবনের সঙ্গী রায়হানকে পেয়ে পরস্পর পরস্পরকে ফুলের মতো করে স্পর্শ করে গড়ে ওঠে গভীর প্রেম। জীবনটাকে সুন্দর করে গড়ে তুলে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু অবশেষে তা আর পারে না কবিতা। কবিতা আর রায়হান প্রেমের তীব্রতা নিয়ে তারা পরিণয়ের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায় লোভ আর অর্থ নামক দুটি শব্দ। নিজের মা ও ভাইয়ের ষড়যন্ত্রের শিকার হয় এ পবিত্র প্রেম। অবশেষে রাতের আকাশে তারাদের মাঝে হারিয়ে যান প্রিয়দর্শিনী কবিতা। উপন্যাসে সমাজে নারীর সংগ্রামী জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এবং সমাজকে উপন্যাসের মাধ্যমে একটি ম্যাসেজ দেয়া হয়েছে যে, হিংসা-দ্বেষ-এর মাধ্যমে মৃত্যু হয়েছে প্রেমের।

নিউজজি : উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টা বেশি প্রাধান্য পায়?

জয়শ্রী দাস : উপন্যাসগুলোতে প্রকৃতি ও প্রেমের প্রাধান্য পায়। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে মনের একটা পরিবর্তন ঘটে। সে বিষয়টি বারবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ফুল, পাখি, গাছ, নদী, চাঁদনি রাত, ঋতু বৈচিত্র্য আমার ভালোবাসা এবং এ বিষয়গুলোর সাথে জড়িয়ে আছে এক নিষ্পাপ প্রেম। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসার কারণেই হয়তো মধ্যবিত্তের সম্পর্কগুলোর ছায়া বিন্যাস হয়েছে আমার প্রতিটি উপন্যাসে।

নিউজজি : একজন লেখক হিসেবে পাঠক তৈরিতে কী ভূমিকা গ্রহণ করা যায় বলে আপনি মনে করেন?

জয়শ্রী দাস : সবুজ অরণ্যের মাঝে এ ঝুম ধরা বৃষ্টিতে তোমার হাতে আমার হাত রাখতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় প্রকৃতির তেমন পরিবর্তন না ঘটলেও তোমার হাতে আমার হাতের পরিবর্তে, তোমার হাতেও মোবাইল আমার হাতেও মোবাইল। মাঝখান দিয়ে কী হলো- প্রযুক্তির ব্যবহারে সম্পর্কগুলো পাখির পালকের মতো হাওয়ায় ভাসতে লাগল। এই সম্পর্কগুলোকে গাঢ় থেকে গাঢ়তর  করতে হলে মানুষকে প্রযুক্তির ব্যবহারের পরিবর্তে বইমুখী করতে হবে।

পাঠক তৈরিতে পরিবারের ভূমিকা মুখ্য। সন্তান যেকোনো বয়সী হোক না কেন? তার হাতে মোবাইল বা যেকোনো প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিবর্তে বই তুলে দিতে হবে। বইয়ের মধ্যে আবেগ থাকে, ভালোবাসা থাকে, প্রেম থাকে আর গেইম-এর মধ্যে এই ধরনের কোনো শুদ্ধ শব্দের ব্যবহার নেই। তবে কী থাকে প্রযুক্তির ব্যবহার বা গেইমের মধ্যে। বন্দুকের শব্দ থাকে। আজ আপনি গেইম-এর মাধ্যমে সন্তানের হাতে তুলে দিচ্ছেন পিস্তল বা বন্দুক।  ভবিষ্যতে এই  পিস্তলটি আপনাকে সংসার থেকে বিতাড়িত করে বৃদ্ধ আশ্রমে আশ্রয় তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। তাই অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ, নিজের পিঠ বাঁচাতে সন্তানের হাতে বই তুলে দেন। যার নাম ভবিষ্যতের ভালোবাসার সঞ্চয় ভাণ্ডার।

নিউজজি : প্রথম বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলুন-

জয়শ্রী দাস : একজন লেখকের প্রথম বই প্রকাশের পেছনে কত রকমের আবেগ, হতাশা, উদ্বেগ ও উত্তেজনার অনুভূতির রাজ্যে বসবাস করতে হয়, যা একমাত্র সে-ই জানে। বইটা যখন আলোর মুখ দেখে ঠিক তখন যেন সৃষ্টির আনন্দের অনুভূতি শরীরজুড়ে প্রজাপতি হয়ে ঘুরে বেড়ায়। আমার আনন্দের প্রজাপতি ধরা দিয়েছিল যেদিন, সেদিনটি ছিল শুক্রবার, ৮ ফেব্রুয়ারি। সেদিন বাইরে ফাল্গুনের বাতাস ছিল কিন্তু মনে ছিল খুব অস্থিরতা। আমার প্রথম উপন্যাস ‘একটি অন্যরকম গল্প’র মোড়ক উন্মোচন করেছিলেন লেখক আনিসুল হক। আমার বুকের বাম পাশটা কাঁপছিল, মনে ছিল পৃথিবীর সব ভালোলাগা, ভালোবাসা, বেদনার নীল কাব্য আমার ওপরে ভর করেছে। মনে হয়েছিল আমার মধ্যে আমি নেই, নতুন কাউকে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছি আমি। সেদিন বাতাসে ছিল নতুন বইয়ের নতুন সুবাসের উড়াউড়ি। কিছুটা বেসামাল ছিলাম আমি। যেমনটি ছিলাম আমার প্রথম সন্তান জন্মের সময়।

নিউজজি : লেখালেখির ইচ্ছেটা কেন হলো?

জয়শ্রী দাস : আমার বয়স যখন পাঁচ বছর, তখন বই পড়তে ও লিখতে শিখেছি। শৈশবে সারাদিন কোনো কাজ নেই কর্ম নেই, ঘরভর্তি বই আর বই। সেগুলো নেড়েচেড়ে দেখা আর বড়দের সাথে ভবঘুরের মতো শহরে ঘুরে বেড়োনো। এই দুই কাজ। এই দুই কাজ করতে করতে মনে হলো আমি বই পড়া আর লেখা ছাড়া পৃথিবীতে কোনো বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে পারিনি।

খেয়াল করলাম প্রতিদিন একটু আধটু না লিখলে আমি ঠিক স্থির থাকতে পারি না। নিজেকে স্থির রাখতে, ভালো রাখতে শুরু করলাম লেখালেখি। হাজারও ব্যস্ততার মাঝেও লেখালেখির মুহূর্তটা আমার কাছে অন্যরকম সুখ অনুভূতি কাজ করে। অন্য সব কাজে কত সময় নষ্ট করি কিন্তু লেখালেখির সময়টাকে আমি কোনোভাবেই নষ্ট সময় মনে করি না। এই সময়টাই আমার কাছে শ্রেষ্ঠ সময় মনে হয়।

নিউজজি : লেখক জীবনের মজার কোনো অভিজ্ঞতার কথা বলুন-

জয়শ্রী দাস : ‘সে এবং দ্বিতীয়’ নামের আমার উপন্যাস যেদিন মোড়ক উন্মোচন হবে তার আগের দিন আমার হাতে প্রকাশক বেশ কিছু বই পৌঁছে দিলেন। আমার লেখার কিছু জ্ঞানী পাঠক আছে যারা সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তাদের কজনকে আগের দিন বইটি পড়তে দিলাম। একজন তো খুব অবহেলার সাথে বইটি গ্রহণ করলেন। সেদিন রাত আড়াইটার দিকে হঠাৎ তার মোবাইল ফোন থেকে কল এলো। আমি ভয়ে কলটা রিসিভ করলাম। সঙ্গে সঙ্গে অপর পাশ থেকে খুব জোরে জোরে কান্নার শব্দ। আমি নিশ্চিত মনে করলাম তার পরিবারের বড় রকমের কোনো বিপদ ঘটেছে এই মুহূর্তে সেজন্য সে এত রাতে কল করে কান্নাকাটি করছেন। কিন্তু না আমার ভাবনাটা শেষ না করতে করতে তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘তুমি কেন মেয়েটিকে মেরে ফেললে? তোমার বিচার হবে। মেয়েটির কষ্টে ঘুম হবে না। ভালো লিখেছ। আগামীকাল মোড়ক উন্মোচনের সময় বিস্তারিত বলব।’ আমি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললাম, ঠিক আছে। পড়ার জন্য ধন্যবাদ। আগামীকাল মেলায় দেখা হবে। ওই রাতের ঘটনাটা আজও মাঝে মাঝে মনে পড়লে নিজে নিজে খুব হাসি। আর ভাবি এটাই মনে হয় লেখক জীবনের অন্যতম একটা সার্থকতা।

নিউজজি : বাংলাদেশের সৃজনশীল লেখালেখির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

জয়শ্রী দাস : বাংলাদেশকে যদি শান্তির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের পাল্লা দিতে হয় তবে বই পড়া এবং সৃজনশীল লেখালেখির কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি এবং বর্তমান পরিস্থিতির ওপর দাঁড়ানো ভবিষ্যৎ সৃজনশীল লেখালেখির কাজে নিয়োজিত লেখকদের জন্য কিছুটা অন্ধকার। কারণ আজকাল মানুষেরা বইয়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, বইয়ের পরিবর্তে তারা ডিজিটাল ডিভাইসের ওপরে বেশি নির্ভরশীল হচ্ছেন। যা আগামী প্রজন্মের জন্য ও মননশীল জাতি গঠনে হুমকিস্বরূপ মনে হচ্ছে।

নিউজজি : লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যতের স্বপ্ন কী?

জয়শ্রী দাস : সমাজ পরিবর্তনের একমাত্র হাতিয়ার হলো লেখালেখি। আর এই লেখালেখির মাধ্যমে ভবিষ্যতে জাতি গঠনে লেখক ও প্রকাশকগণ সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষেরা বই থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করছে। বই পড়ার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং এ আন্দোলনের মাধ্যমে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হবে বলে বিশ্বাস করি, স্বপ্ন দেখি। বই নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন হলো- বইয়ের প্রতি সবার মমত্ববোধ তৈরি হোক। ভালো বই মানবিক মানুষ তৈরিতে ভূমিকা পালন করুক। তবেই আমার ভবিষ্যতের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে।

নিউজজি/জেডকে

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ