অন্যান্য
  >
নারী দিবস

আমি মুক্ত বলাকা এক

অনাম্নী ঊর্মি ৭ মার্চ , ২০১৯, ১৪:৪২:৩১

  • আমি মুক্ত বলাকা এক

আমার বাবা ছিলেন একটু অন্যরকম। সংসার, স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি মায়াদয়া কম। আমার নানা ছিলেন ধনী। একমাত্র মেয়ে ছিলেন আমার মা। আরো তিন মামা ছিলেন। আমার বাবা কিছুদিন ভালো থাকতেন। সংসারে কোনোরকম কোনো সমস্যা হলে আমাদের ফেলে পালিয়ে যেত। আমি ছিলাম ভাই-বোনদের মধ্যে বড়। বাবার এমন পাগলাটেপনা দেখে নানা-নানি আমাকে লালনপালন করেছেন। আমার জন্মের তিনদিন পর বাবা আমাকে ফেলে পালিয়ে যায়। আমার নানা ও মামারা বলত এটাকে ফেলে দাও। দরকার পড়লে আমার মাকে জামাই কিনে বিয়ে দিবে। (নানা ছিলেন ঢাকাইয়া ও ধনী লোক অনেকে টাকার লোভে তার মেয়েকে বিয়ে করবেন) আমাকে কোনো এতিমখানায় দিয়ে দিবে শুনে আমার মা আমাকে হাত ছাড়া করত না। যদি নানা চুরি করে আমাকে নিয়ে যায়। রাতে মায়ের বুকের ওপর আমাকে নিয়ে ঘুমাতেন। টয়লেটে গেলেও সাথে করে নিয়ে যেতেন।

আমি একটু বড় হয়ে উঠালাম। কালো ছিলাম কিন্তু চেহারায় ছিল মায়া ও নাদুসনুদুস গঠনের। তারা আমাকে দেখে মায়া করল এবং লালনপালন করতে লাগল আর খুব ভালোভাবেই। আর মা-বাবাকে খুঁজে বের করে আবার সংসার করত আবার ভাঙ্গত। যাইহোক- মামারা ছিল খুব রাগী। বিশেষ করে আমার বড় মামা তিনি আমাদের অনেক বেশি শাসন করতেন। আমি খুব লজ্জাবতী ছিলাম। কখনো কারো মুখের ওপর কিছু বলতে পারতাম না। কড়া শাসনে স্বাধীনতা বলতে কিছু ছিল না। মামারা বিয়ে করলেন তাদেরও সন্তানাদি হলো। আমি বড় হয়ে উঠতেই শুরু করলাম মামাতো ভাই-বোনদের লালনপালন। পড়াশোনা, কোচিংয়ে যাওয়া, সংসারের কাজ করা।

আমি যখন নবম শ্রেণিতে উঠি আমার ক্লাসমেটের সাথে রিলেশন করে আমার বিয়ে হয়ে গেল। আসলে তখন প্রেম কী? বিয়ে কী? এসব কিছু বুঝতাম না। আমি একটা ঘোরে পড়ে বিয়ে করে নিলাম। তখন আমার স্বামীও বেকার ছিল। আমরা প্রায় সমবয়সী ছিলাম। সেও তেমন কিছু বুঝত না। এদিকে, আমি এমন একটা কাজ করায় আমার মা অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ল। মামারাও আমাকে মেনে নিতে চাচ্ছে না।

মা তিন মাস পর মারা গেলেন। তখন একটু একটু করে মেনে নিলেন আমার মামারা আমাকে। আমার স্বামীর ভাই-বোন মিলে পাঁচজন ছিল। ছোট দুই ননদিনীকে ছোট পাই। আমি আসলে যখন যাকে ভালোবাসি একদম উজার করে দিই। বিয়ের সময় আমার বয়স ছিল মাত্র তেরো কি চৌদ্দ। খুব সহজসরল ছিলাম কিন্তু সংসারের কাজে খুব খুব পটু ছিলাম। আমাকে কোনো কাজ আমার শাশুড়ির দেখা দেয়ায় লাগেনি। সংসারের কাজে নিজেকে জলের মতো মিশিয়ে নিলাম।

এদিকে, আমার শ্বশুর জানতে পেরেছে আমার নানার বাড়ির অবস্থা ভালো কিন্তু আমাকে কিছুই দেয়নি। প্রথমে আমাকে অনেক আদর করত। পরে শ্বশুর একটু আদর কম করত। কিন্তু আমার শাশুড়ি ও ননাস আমাকে মেনে নিতেই পারেনি। ননাস বলত আমি তাদের পায়ের নখের সমানও হইনি। শাশুড়ি বলত আমার এত সুন্দর একটা ছেলে অন্য কোথাও বিয়ে করালে অনেক কিছু পেতাম। বাবার বাড়ি থেকে কিছু দেয়নি বলে কাজের মেয়ের মতো রাখত। না পেতাম গোসল করার মতো কোনো সাবান। বেশি পরিশ্রমের জন্য মুখে খাওয়ার রুচিও ছিল না তখন।

স্বামীকে বলেছিলাম একদিন আমার কাজ করতে অনেক কষ্ট হয় (কারো ছেলের বউ হয়ে যখন জন্মেছি তো সংসারের কাজ তো করতেই হবে। কিন্তু যেখানে পাঁচজনের কাজ করতে পারব সেখানে দশজনের কাজ করতে একটু কষ্ট হবেই স্বাভাবিক এটা) স্বামী বলল, আরে তোমার তো কাজ করে অভ্যাস আছে মামার বাড়ি কত কাজ করছো আগে। আমি কোনো কথা বললাম না। ভেবে নিলাম আমি আজ থেকে কারো বউ নই তাদের দাসী। এক মামার পরামর্শে বাচ্চাকাচ্চা পড়াতে শুরু করলাম। লেখাপড়া কম থাকায় আগে নিজে পড়েছি তারপর ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াতাম। এতদিনে এক ছেলের মাও হলাম। সংসার, টিউশন ও সন্তান লালন করে পাঁচ বছর কেটে গেল।

শ্বশুর মারা গেলেন, ছেলেদের কাঁধে এলো সংসার। অভাব অনটনে বেহাল অবস্থা সংসারের। আমার ছেলের পাঁচ বছর বয়স হলে বুঝতে পারি তার শারীরিক কোনো সমস্যা আছে। ডাক্তার দেখালে বোঝা যায় আমার রক্তে একটা সমস্যা আছে এবং সেই কারণে আমার ছেলে DMD (প্যারালাইজড) রোগী। আর আমিও আর সন্তান নিতে পারব না। আগে আমি টিউশন করে সংসারে সাহায্য করতাম। ছেলের প্যারালাইজড হওয়ার পর আর কিছু করতে পারতাম না। আমি আলাদা হয়ে গেলাম শাশুড়ি থেকে। স্বামী আগের তুলনায় অনেক ভালো। আমার সংসারে কোনো অভাব অনটন নেই কিন্তু আমাকে সে কোনো মায়া করে না। অসুস্থ আমি কাজ কর্ম করতে সমস্যা তবু আমাকে ডাক্তার দেখায় না। সন্তান নেয়া যাবে না জেনেও চাপ দিতেন সন্তান নিতে। ছেলের জন্য রাত জাগি তবু আমাকে কোনো কাজে সাহায্য করত না।

যাইহোক- আসলে আমি নারী অধিকার বলতে যতটুকু জানি। নারীকে স্বাধীনতা দেয়া আর তার মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানো। বাবা অবহেলা করেছে বলে স্বামীও অবহেলা করবে। মামি কাজ করিয়েছে বলে শাশুড়িও কাজের মেয়ের মতো আচরণ করবে। অসুন্দর কালো বলে ননদিনী ও ননাস তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে। নারীর প্রাপ্য অধিকার আমাদের আগে নিজের পরিবার থেকে, তারপর সমাজ, তারপর দেশ, তারপর বিশ্ব থেকে আদায় করতে হবে। আমাদের বোঝাতে হবে নারী অধিকার বলতে আমাদের নোংরামি করতে সুযোগ দেয়া নয়। আমরা যেন স্বাধীনভাবে চলে সুস্থ শ্বাসে জীবন ধারণ করতে পারি। 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers