সাহিত্য

কবিগুরুর শিশুতোষ গল্প-কবিতা

ফারুক হোসেন শিহাব ৬ আগস্ট , ২০২১, ০১:২১:০০

  • কবিগুরুর শিশুতোষ গল্প-কবিতা

‘মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে

মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।

তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে

দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে, 

আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার পরে

টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে।

রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে

রাঙা ধুলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে।’

মায়ের কাছে কল্পিত অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনি শুনতে গিয়ে মাকে একদল ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা করে ছোট্ট খোকা। ভয়ংকর ডাকাত দলকে কুপোকাত করে নিজের মাকে নিয়ে বীরের বেশে অজানার দেশে পাড়িজমায় সেই বালক। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বীরপুরুষ’ কবিতায় শিশুদের কল্পনা রঙিন ভুবনের সন্ধান দেয়ার পাশাপাশি তাদের আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে গিয়ে এভাবেই কবিতা রচনা করেছেন।

বাঙালির ভালোবাসার কবি রবীন্দ্রনাথ তার বিভিন্ন লেখায় শিশুদের কল্প-জগতের বর্ণিল ছবি আঁকতে গিয়ে একজন সৃজনশীল মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে চেয়েছেন তাদের। বড়দের জন্য যেমন তিনি কবিতা, গল্প, গান, নাটক, উপন্যাস লিখে গেছেন তেমনি শিশুদের স্বপ্ন, চিন্তা, দুষ্টুমি কিংবা আনন্দ-উল্লাস নিয়েও রয়েছে তার অসংখ্য ছড়া, কবিতা, গান, গল্প, নাটকসহ নানারকম শিশুতোষ রচনা। মায়ের সাথে শিশুর যে মধুময়  নিবিড় সম্পর্ক, তা পৃথিবীতে আর কারো সাথেই তুলনা করা যায় না।  

শৈশবে মাকে হারানোর পর কবির সমস্ত হৃদয়জুড়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন মা। তার অন্তরের এ হাহাকার আবার নতুন করে অনুভব করলেন নিজের মাতৃহারা সন্তানদের দেখে। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মারা যাওয়ার সময় ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথের বয়স ছিল আট বছর। মেয়ে রেনুকার বারো আর মীরার ছিল দশ বছর।

মা-হারা সন্তানদের দেখাশোনা করতে গিয়ে তাদের অতি আপনজন হয়ে উঠলেন তিনি। মেয়ে রেনুকা কঠিন যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হলে হাওয়া বদল করতে তাকে নিয়ে আলমোড়ায় গিয়েছিলেন। সেই পাহাড়ি পরিবেশে কবি সন্তানদের নিবিড়ভাবে পেয়েছিলেন। সেখানেই রচনা করেছেন কবির ‘শিশু’ কাব্যের অধিকাংশ কবিতা। তিনি লিখেছেন-

‘খোকা মাকে শুধায় ডেকে,

এলেম আমি কোথা থেকে

কোনখানে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে।’ 

শিশু দেবলোক থেকে আসে ধুলোমলিন পৃথিবীতে। এখানে এসে সে মাকে যেমন পূর্ণ করে দেয় তেমনি শিশুও মাতৃস্নেহে আপ্লুত হয়ে স্নেহ-আদরে পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে। শিশুর সাথে মায়ের এ সর্ম্পকে কবি তুই সম্বোধনে তুলে ধরেছেন তার কবিতায়-

‘মা গো, আমায় ছুটি দিতে বল

সকাল থেকে পড়েছি মেলা।’

প্রাণের আবেগ, উচ্ছ্বাসের শুধু কাব্যিক রূপায়ণই শুধু নয়। আনন্দ, আবেগ এবং কল্পশক্তির বিরল প্রকাশ ঘটেছে কবির কবিতায়। তাই ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ি কবিতায় তিনি লিখেছেন-

‘ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ির

পাঁচ বোন থাকে কালনায়

শাড়িগুলো তার উনুনে বিছায়

হাঁড়িগুলো রাখে আলনায়।’

রবীন্দ্রনাথের কবিতায় তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে দিয়ে শিশুর গণ্ডিবদ্ধ জীবনের বাইরে পাখির মতো স্বাধীনভাবে ডানা মেলে দেয়ার ইচ্ছে যেমন ব্যক্ত হয়েছে তেমিন সাধারণ মানুষের মুক্ত জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়েছে ‘সাধ’ কবিতায়।

শিশুর মনের ভিতর থাকে এক কল্প-জগত। শিশুদের নিয়ে লিখতে গিয়ে কবি নিজেও যেন শিশু বনে গেছেন। শিশুদের চাওয়া-পাওয়া, আধো-আধো কথা বলা তাঁর শিশুকাব্যে হয়েছে জীবন্ত-প্রাণবন্ত। কবির শিশুমন গলির পাশের ফেরিওয়ালাকে দেখে ফেরিওয়ালা, মালিকে দেখে মালি, পাহারাদারকে দেখে পাহারাদার আর ঘাটের মাঝি হতে চায়। এভাবেই শিশুর চাওয়া-পাওয়া, আধো আধো কথা তার কাব্যে আরো প্রাণবন্ত ও জীবন্ত হয়ে ওঠে। বৃষ্টিস্নাত মৌসুমে ছুটির ঘণ্টা বাজানোর ঢংয়ে তিনি লিখেছেন- 

‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে

বাদল গেছে টুটি,

আজ আমাদের ছুটি ও ভাই,

আজ আমাদের ছুটি।’

শিশু-কিশোরদের জন্য তিনি লিখেছেন ছন্দের ঢেউ তোলা মিষ্টি মিষ্টি ছড়া-কবিতা। লিখেছেন মজার মজার গল্প ও নাটিকা। তাঁর লেখা শিশুতোষ গানের সংখ্যাও অনেক। যা ছোটো-বড়ো সবার হূদয় ছুঁয়ে যায়। শিশুদেরকে রবীন্দ্রনাথ ভীষণ ভালোবাসতেন। ওদের জন্য কখনো তিনি সৃষ্টি করেছেন কল্পনার জগত্। কখনো সাজিয়েছেন বাস্তবতার চিত্র। তাঁর লেখা ‘শিশু ভোলানাথ’, ‘খাপছাড়া’, ‘শিশু’, ‘ছড়ার ছবি’ ইত্যাদি আমাদের শিশুসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তাঁর লেখা ছোটগল্পে ফুটে উঠেছে এ দেশের অজপাড়া গাঁয়ের কিশোর-কিশোরীদের কথা। 

‘ছুটি’ গল্পে ফটিকের মতো চির চঞ্চল চরিত্রকে তিনি চিত্রিত করেছেন। শিশুতোষ নাটক ‘ডাকঘর’-এ তিনি এঁকেছেন অসুস্থ বালক অমলের আকুতিকে। অমল চায় বাইরের পৃথিবীটাকে দু’চোখ ভরে দেখতে। কিন্তু কবিরাজের বারণ। তাকে সেড়ে তোলার জন্য সারাক্ষণ একটি ঘরে বন্দি রাখা হয়। সে পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। সবাইকে অনুনয় করে বলে তাকে মুক্ত করে দিতে। রাজ বাড়ির ঘণ্টা, দূরের আকাশ, গাঁয়ের পথ ওকে হাত বাড়িয়ে ডাকে।

প্রকৃতিদরদী এই কবি প্রকৃতির নানান বিষয়কে তুলে এনেছেন শিশুতোষ ছড়া-কবিতায়। রবীন্দ্রনাথ যখন ছোটদের জন্যে লিখেছেন তখন তিনি নিজেকে ছোট্ট শিশু ভেবেছেন। শিশুর কচি চোখের দৃষ্টিতে দেখেছেন আর লিখেছেন শিশুপাঠ্য ভাষাতেই। তাই কবি যখন ছোট নদীর কথা লিখলেন-

‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে

বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে’

কবিতাটি পড়তে পড়তে শিশুরা নিজের চোখে দেখা নদীটির মিল খুঁজে পায়। কেউ কেউ ধরেই নেয় তাদের গাঁয়ের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটির কথাই লেখা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন সচেতন খেয়ালি মনের মানুষ। বিচিত্র রকম সাধ বা ইচ্ছে ছিল তাঁর মনের মধ্যে। ছোটদের মতো তার মনটাও যখন যা দেখেছেন তাই করতে চেয়েছেন, তাই হতে চেয়েছেন।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সব্যসাচী লেখক কবিগুরু সাহিত্যের সকল শাখায় পদচারণা করেছেন সগৌরবে। শুধু বড়দের নয় ছোটদের নিয়েও তিনি অনেক লেখা লিখে গেছেন। ছোটদের নিয়ে যে কবিতা, গল্প, নাটক লিখেছেন তার ভেতর আছে গভীর কোনো তত্ত্ব। বিশেষ করে ‘শিশু’ ও ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যে কবি শিশু মনের নানান রহস্য উন্মোচনে উদ্যোগী হয়েছেন। শিশুদের নিয়ে লেখা তার অন্যান্য বইয়ের মধ্যে আছে সহজপাঠ-১, সহজপাঠ-২, খাপছাড়া, ছড়া ও ছবি, গল্পস্বল্প, ছড়া, ছেলেবেলা, বিশ্বপরিচয়, লিপিকা, মুকুট প্রভৃতি। এ ছাড়াও সোনারতরী, কাহিনি, কড়ি ও কোমল, চিত্রা, ক্ষণিকা, কল্পনা, লেখন প্রভৃতি বড়দের বইয়েও শিশু-কিশোর উপযোগী অনেক কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।

আধুনিক যুগে উন্নত চিন্তা এবং সাহিত্য প্রকাশের নতুন নতুন যেসব ধারা দেখা যায় তার মধ্যে ছোটগল্প একটি। উনিশ শতকে এসে এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা এই তিন মহাদেশে কয়েকজন প্রতিভাবান সাহিত্যিক একযোগে ছোটগল্প লেখা শুরু করেন। এরা হলেন-  ফ্রান্সের ‘গী দ্যা মপাসা’, রাশিয়ার ‘আন্তন চেখভ’, ইংল্যান্ডের ‘সমারসেট মম’, ভারতবর্ষের ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। এরা প্রত্যেকেই ছোটগল্প শুরু করেন নিজ নিজ দেশে নিজেদের মাতৃভাষায়।

বাংলা ছোটগল্প রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে হাঁটি হাঁটি পা করে এগোতে থাকে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশক এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে নিরন্তর গতিতে এগিয়ে চলা তার ছোটগল্প ক্রমে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদরূপে বিবেচিত হয়। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে পদ্মার বাঁধভাঙা ঢেউ, ষড়ঋতুর লীলা-বৈচিত্র্য এবং ভাগ্যহত মানুষের গভীর জীবনবোধ স্পষ্টভাবে মূর্ত হয়ে ওঠে। তার ছোটগল্পে উঠে এসেছে গ্রাম-বাংলার অপরূপ সৌন্দর্য, নদীর কুল কুল বয়ে চলা, পালতোলা নৌকার সারি।

মূলত, জমিদারী-সূত্রে বাংলাদেশে অবস্থানকালে গ্রাম-বাংলার প্রকৃতি এবং প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা মানুষের কাছাকাছি এসে নতুন করে গল্প লেখায় অনুপ্রেরণা পান রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের প্রথম ছোটগল্প প্রকাশিত হয় ১২৮৪ সালের শ্রাবণ মাসে ভারতী পত্রিকার ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যায়। গল্পটির নাম ভিখারিনী। ১৮৯১ সালে সাপ্তাহিক “হিতবাদী” পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পেয়ে রবীন্দ্রনাথ ছয় সপ্তাহে ছয়টি গল্প রচনা ও প্রকাশ করেন। গল্পগুলো হলো- দেনা-পাওনা, গিন্নি, পোস্টমাস্টার, তারাপ্রসন্নের কীর্তি, ব্যবধান এবং রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা।

‘সাধনা’ পত্রিকার সম্পাদনার সময় রবীন্দ্রনাথ বারো মাসে বারোটি গল্প লেখেন। এগুলো হলো- খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, সম্পত্তি সমর্পণ, দালিয়া, কঙ্কাল, মুক্তির উপায়, ত্যাগ, একরাত্রি, একটি আষাঢ়ে গল্প, জীবিত ও মৃত, স্বর্ণমৃগ এবং জয়ই পরাজয়। এভাবেই রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প রচনা চলতে থাকে।

ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত মমতা দিয়ে শিশু চরিত্রগুলো অংকন করেছেন। মূলত, বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ শিশু-কিশোর গল্পগুলো রবীন্দ্রনাথের হাতেই লেখা। তার লেখা কাবুলিওয়লা গল্পের মিনি আর দূরদেশের এক কাবুলিওয়ালার কথা ভোলা যায় না।  স্নেহ ভালোবাসা যে দেশকাল বা জাত-পাত মানে না, এ গল্পে তাই ফুটে উঠেছে চমৎকারভাবে। এ ছাড়া পোস্টমাস্টার, ছুটি, বলাই, ইচ্ছেপূরণ প্রভৃতি গল্প আজও মানুষের মনে দোলা দেয়।

রবীন্দ্রনাথের রচনাবলীর উল্লেখযোগ্য অংশ শিশুতোষ। ১৮৯৪ সালে কবির প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। বইটির নাম ‘ছোটগল্প’। এরপর আরো অনেক গল্পের বই প্রকাশিত হয় তার। পরবর্তীতে সমস্ত গল্প একত্র করে গল্পগুচ্ছ নাম দিয়ে চারখণ্ডে প্রকাশ করা হয়। কবির সর্বশেষ গল্পের নাম ‘প্রগতি সংহার’। তবে শেষ পুরস্কার নামের একটি খসড়া গল্পও রেখে যান তিনি। সমাজ ব্যবস্থার শেকড়ে অবগাহন করে রবীন্দ্রনাথ তার গল্পে কঠিন বাস্তবতাকে যেভাবে তুলে ধরেছেন সেখানে আজও তিনি শ্রেষ্ঠতম আসনে অধিষ্ঠিত।

রবীন্দ্রনাথ তার লেখায় বাঙালির চিরদিনের হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, চাওয়া-পাওয়া এবং সুখ-দুঃখের যে ছবি এঁকেছেন, সময়ের পরিবর্ত হলেও তা আজও অম্লান। বাংলার সভ্যতা-সংস্কৃতি, মাটি ও মানুষের এ বিরল সাধক যখন  যেখানে হাত দিয়েছেন তখন তা হয়ে উঠেছে আরো সরস, উর্বর ও বৈচিত্র্যময়। মূলত রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সর্বস্তরের মানুষের কবি। তাই শিশুরাও তাঁর স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়নি। বাঙালির চেতনা প্রবাহের এই ত্রাণকর্তার স্নেহ–ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়নি  শিশু-কিশোররা।

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers