সাহিত্য
  >
প্রবন্ধ

শত প্রতিকূলতায়ও স্বপ্নকে জয় করেছিলেন কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন

নিউজজি প্রতিবেদক অক্টোবর ৩০, ২০১৯, ১৮:২৭:৩৬

  • শত প্রতিকূলতায়ও স্বপ্নকে জয় করেছিলেন কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন

‘ঐ দেখা যায় তালগাছ/ ঐ আমাদের গাঁ/ ঐ খানেতে বাস করে/ কানা বগীর ছা/ ও বগী তুই খাস কি/ পান্তাভাত চাস কি/ পান্তা আমি খাই না/ পুঁটিমাছ পাই না/ একটা যদি পাই/ অমনি ধরে গাপুস-গুপুস খাই।’ জনপ্রিয় এই ছড়াটির রচয়িতা কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন। 

আমাদের আধুনিক সাহিত্যের এক অগ্রণী পুরুষ খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন। বাংলা সাহিত্যের হাতে গোণা যে কজন কবি-সাহিত্যিক নিজস্ব গণ্ডি পেরিয়ে স্বীয় মেধা, মনন, যোগ্যতা ও প্রচেষ্টায় বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়েছেন নিঃসন্দেহে কবি মঈনুদ্দীন তাদের মধ্যে অন্যতম। 

আজ ৩০ অক্টোবর গুণী এ কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন ১৯০১ সালেরে এইদিনে মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার চারিগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে মাত্র ৯ বছর বয়সে মাতা ও ১২ বছর বয়সে পিতাকে হারান। তারা উত্তরাধিকারীদের জন্য কোনো ভূসম্পত্তি বা অন্য কোনো সহায় সম্পদ রেখে যেতে পারেননি। ফলে অল্প বয়সেই মঈনুদ্দীনকে জীবিকার অনুসন্ধান করতে হয়।

এতাবস্থায় তিনি কলকাতা গিয়ে সেখানে পুস্তক-বাঁধাই কর্মী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ছোটবেলাতেই বই পড়ার প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল মঈনুদ্দীনের। ফলে কাজের পাশাপাশি তিনি নৈশকালীন বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে থাকেন। চরম দারিদ্রতায় থেকেও স্বপ্নকে জয় করে তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির একজন সার্বজনীন সাহিত্যিক। 

স্কুলে থাকাকালীন সময় থেকেই চুপি চুপি ছোট ছোট ছড়া-কবিতা লিখতে শুরু করেন মঈনুদ্দীন। দিনে কারখানার কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন আর রাতের বেলায় বই হাতে স্কুলে পড়তে যান। এই সময় বালক কবি মঈনুদ্দীনের সঙ্গে পরিচয় হয় একই মহল্লার ছাত্র খন্দকার আবদুল মজিদ নামে এক ছেলের সঙ্গে।

আবদুল মজিদ তিনিও ছিলেন একজন সাহিত্য সেবক। সাহিত্য নিয়ে আলাপ আলোচনায় একসময় দু'জন ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। দুই বন্ধু মিলে রাত জেগে হাতে লিখে প্রকাশ করেন 'মুসাফির' নামে একটি দেয়াল পত্রিকা। এই দেয়াল পত্রিকা প্রকাশের পর মঈনুদ্দীন আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। তারপর তিনি তার লেখা পাঠাতে লাগলেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। 

কবি মঈনুদ্দীন নিবিষ্ট মনে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লিখতে থাকেন এবং কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে দেখা করে পরিচিত হয়ে স্নেহ-ধন্য হন। এমনিভাবে একদিন দৈনিক 'নবযুগ' পত্রিকা অফিসে গিয়ে বিদ্রোহী কবি নজরুলের সঙ্গে দেখা করে আলাপচারিতায় মুগ্ধ হন মঈনুদ্দীন।

১৯২১ সালে তার লেখা ‘খোদার দান’ নামে একটি প্রবন্ধ ছাপা হয় মাসিক 'সহচর' পত্রিকায়। পত্রিকার পাতায় ছাপাক্ষরে নিজের নাম দেখে কিশোর কবি আনন্দে হয়ে পড়েন আত্মহারা এবং সাহিত্য সাধনায় একাগ্রচিত্তে নিমগ্ন হন। তারপর তিনি নিজেই প্রকাশ করেন তার লেখা ‘উচিৎ কথা’ নামে ছোট্ট একটি কবিতার বই।

পরবর্তীকালে তিনি কলকাতা কর্পোরেশন ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতায় নিয়োজিত হন এবং এখানে বিশ বছর কাজ করেন। শিক্ষকতাকালীন তিনি শিশুদের জন্য লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন ৫০ ও ৬০-এর দশকে শিশুতোষ সাহিত্য রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন।

তার রচিত অনেক ছড়া এখনও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের মুখে উচ্চারিত হয়। তার লেখা ‘কাঁনা বগির ছা’ কবিতাটি বাংলাদেশের শিশুদের নিকট অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং ‘যুগশ্রেষ্ঠ নজরুল’ নামক জীবনীটির জন্য তিনি বহুলভাবে সমাদৃত। বহুমুখী প্রতিভার কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন সারা জীবন শিশুদের মনোভূমি উৎকর্ষতার জন্য নিরলসভাবে সাহিত্য সাধনায় নিবেদিত ছিলেন। ছোটবেলা থেকে তিনি ব্যাপৃত ছিলেন জীবন সংগ্রামে। তার একাগ্র সাধনা, অধ্যবসায় ফলে তিনি সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে একের পর এক সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে সক্ষম হন। 

১৯২৩ সালে মুহম্মদ মঈনুদ্দীন সাপ্তাহিক মুসলিম জগত পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হন। পত্রিকায় ‘বিদ্রোহ’ শীর্ষক একটি সম্পাদকীয় প্রকাশের দায়ে তাকে ছয় মাস কারাভোগ করতে হয়। হুগলি জেলখানায় থাকাকালীন তিনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হন। নজরুলের পথ অনুসরণ করে মাত্র বাইশ বছর বয়সে ১৯২৩ সালের ১৩ মে ‘মোসলেম জগত’ পত্রিকায় ‘বিদ্রোহ’ শীর্ষক সম্পাদকীয় লিখে কারাবরণ করেন।

পরে নজরুলের স্নেহসিক্ত হয়ে তিনি লিখেছেন ‘যুগস্রষ্টা নজরুল’। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর মুহম্মদ মঈনুদ্দীন ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকায় ‘আলহামরা লাইব্রেরি’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। এখান থেকে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও প্রকাশ করতেন।

কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন কেবল তার যাপিত সময়ের কবি ছিলেন না, তিনি তার সময়কে অতিক্রম করে আমাদের সময়েও সমানভাবে উপস্থিত। তিনি মূলত: মুসলিম-জাগরণের পাশাপাশি মানবতার বার্তাবাহক হতে চেয়েছিলেন। স্মরণযোগ্য তার আদর্শ উক্তিটি হচ্ছে- ‘জীবনকে সহজভাবে নাও, সহজভাবে চলো’। 

তার রচিত শিশু সাহিত্যের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- মুসলিম বীরাঙ্গনা (১৯৩৬), আমাদের নবী (১৯৪১), ডা. শফিকের মোটর বোট (১৯৪৯), খোলাফা-ই-রাশেদীন (১৯৫১), আরব্য রজনী (১৯৫৭), বাবা আদম (১৯৫৮), স্বপন দেখি (১৯৫৯), লাল মোরগ (১৯৬১), শাপলা ফুল (১৯৬২)।

তার লেখাগুলো খুবই সহজ সরল মনোমুগ্ধকর। তার যে কোন লেখা সরলমতি শিশুমনে সহজেই দাগ কাটে। তিনি অনেক কবিতা, গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন। যার মধ্যে অন্যতম কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে- পালের নাও (১৯৫৬), হে মানুষ (১৯৫৮), আর্তনাদ (১৯৫৮); উপন্যাস- অনাথিনী (সহচর পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত, ১৯২৬), নয়া সড়ক (১৯৬৭); ছোটগল্প— ঝুমকোলতা (১৯৫৬)। 

মঈনুদ্দীন ছিলেন সমাজসচেতন একজন কবি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন বাংলাদেশে বর্বর হত্যাকাণ্ড চালায়, তা দেখে কবিহৃদয় বিদীর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলিতে প্রায় প্রতিদিন যা কিছু ভেবেছেন, দেখেছেন, শুনেছেন তা তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন ডায়েরির পাতায়। 

কবি মঈনুদ্দীনের লেখা ডায়েরিতে তার ব্যক্তিগত, সমাজ জীবন, রাষ্ট্রীয় ঘটনা সর্বোপরি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনার প্রস্ফুটন ঘটেছে। যা সময়ের দাবিতে একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে।

খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬০), যুগস্রষ্টা নজরুল রচনার জন্য ইউনেস্কো পুরস্কার (১৯৬০) এবং একুশে পদক (১৯৭৮) লাভ করেন। এছাড়াও নজরুল একাডেমি স্বর্ণপদক (১৯৭৪) লাভ করেন।

খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন ১৯৮১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এই সুন্দর মায়াময় পৃথিবী থেকে নিয়েছেন চির বিদায় নেন। শিশু সাহিত্যিক খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তার শিশুতোষ সাহিত্যে অবদানের জন্য আমাদের হৃদয়ে চির অমর হয়ে রয়েছেন। যুগস্রষ্টা শিশু সাহিত্যিক খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন তার অনবদ্য সৃজনালোয়ে আজন্ম বেঁচে থাকবেন বাংলা ভাষাভাষী অগণিত পাঠকের মাঝে।

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers