সাহিত্য
  >
প্রবন্ধ

প্রবন্ধ: লালন সাঁই মরমি মৃত্তিকার ফসল

আবুল আহসান চৌধুরী অক্টোবর ১৯, ২০১৭, ১৮:০৩:১৭

  • প্রবন্ধ: লালন সাঁই মরমি মৃত্তিকার ফসল

হামতি লালন সাঁইয়ের জীবন ও দর্শন নিয়ে প্রবন্ধ রচনা করেছেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, গবেষক অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী। নিউজজি২৪ডটকমের পাঠকদের জন্য প্রবন্ধটি দুটি পর্বে প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল প্রকাশিত হয় প্রবন্ধটির প্রথম পর্ব। আজ প্রকাশ করা হলো বাকী অংশ।

এদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে জাতিভেদ ও ছুঁতমার্গের অস্তিত্ব ছিল দুষ্টক্ষতের মতোই। এই কুপ্রথা ও কুসংস্কার ধর্মকে আশ্রয় করে সমাজজীবনে শক্ত আসন প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছিল। লালন জীবনভর বর্ণশোষণ, জাতপাত ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও সংগ্রাম করে এসেছেন। তাঁর নিজের জীবনেও এই দুঃখজনক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়েছে অনেকবারই। লালন তাই কখনোই জাতিত্বের সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে চান নি। একজন সংস্কারমুক্ত মানবপ্রেমী বাউল হিসেবে তিনি জানতেন, জাতের অহমিকা ও দ্বন্দ্ব মানুষকে খণ্ডিত ও কূপমুণ্ডক করে রাখে। লালনের আচার-আচরণ ও বক্তব্যে সমকালের মানুষ ধাঁধায় পড়েছিল তাঁর জাত-পরিচয় নিয়ে। লালন বহুবার তাঁর জাত-ধর্ম সম্পর্কে অবাঞ্ছিত প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রদায়িক জাতিত্বে অবিশ্বাসী লালন অনুদার ভেদপন্থিদের এই  কৌতূহল নিরসন না করে পালটা প্রশ্ন করেছেন। তাঁর সেই বক্তব্যের যুক্তিতে জাতবিচারী মানুষের অহংকার চূর্ণ হয়েছে। লালনের গান সমাজ-সম্পর্কের ধারা বেয়ে সাম্প্রদায়িকতা-জাতিভেদ-ছুঁতমার্গ- এইসব যুগ-সমস্যাকে চিহ্নিত করে তার সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছিল। দ্রোহী ও প্রতিবাদী লালন প্রথা-সংস্কার-শাস্ত্রের দাসত্বের শৃঙ্খল ছিন্ন করে নতুন এক কালের অভ্যুদয় কামনা করেছিলেন। নিজেকে সমর্পিত করেছিলেন সমাজহারা মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। শত সংকটেও তিনি বিচলিত হন নি। তাঁর কণ্ঠে শুনি ইহজাগতিকতার জয়ধ্বনি।তিনি হতে চেয়েছিলেন তরঙ্গমুখর এক স্রোতস্বিনী কিন্তু বিরূপ পরিবেশের চাপে হয়ে রইলেন এক গণ্ডুষ পানীয়ের ‘কূপজল’। কিন্তু অমৃতের সন্তান- মহৎ জীবন-অভিসারের যাত্রী লালন ভরসা হারাননি, বিশ্বাসচ্যুত হননি, -সময়ের  প্রত্যাশায় তাই অপেক্ষায় থেকেছেন। হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের শাস্ত্রবাহক মৌলবাদীরাই লালনের বিপক্ষে ছিলেন। মুসলমানের চোখে লালন বেশরা-বেদাতি নাড়ার ফকির, আবার হিন্দুর কাছে ব্রাত্য-কদাচারী-পাষ- হিসেবে চিহ্নিত। 

উত্তরকালেও লালন আক্রান্ত হয়েছেন- বাউল বা লালনবিরোধী আন্দোলন থেমে থাকেনি। জারি হয়েছে ‘বাউলধ্বংস ফৎওয়া’, রচিত হয়েছে ‘রদ্দে নাড়া’, ‘ভ- ফকীর’, ‘সাধু সাবধান’, ‘বাউল একটি ফেতনা’, ‘নেড়ার ফকিরের গুপ্তকথা’-র মতো বিদ্বেষপূর্ণ পুস্তিকা। মৌলবাদী আক্রমণে কিছুকাল আগে ঢাকায় বিধ্বস্ত হয়েছে লালন-স্থাপত্য। তবে আশার কথা, স্বদেশে অনুদার-প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির লালনবিরোধী ভূমিকার পাশাপাশি বাঙালি সংস্কৃতির সুস্থ ধারার চর্চা যাঁরা করেন, তাঁরা লালনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাই লালনের সমাধিসৌধের শান্ত-সৌম্য আবহ ক্ষুণœ করার প্রয়াস প্রতিহত করতে গড়ে ওঠে ‘লালন আখড়া রক্ষা কমিটি’। এই সাধক পদ্মার বুকে ঠাঁই পান ‘লালন-সেতু’ নামকরণের ভেতর দিয়ে। বিবিসি-র জরিপে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ দশ বাঙালির তালিকায় উঠে আসে লালনের নাম। বাংলাদেশের বাউলগান, যার প্রধান রূপকার লালন সাঁই, সেই বাউলগানকে ইউনেস্কো ২০০৫-এ ‘a Masterpiece of the Oral and Intangible Heritage of Humanity’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। দেশের সীমানা পেরিয়ে লালন পৌঁছে গেছেন দেশান্তরে। এইভাবে লালন হয়ে ওঠেন কালান্তরের পথিক- বাঙালি সংস্কৃতির মূলধারার প্রাণপুরুষ। লালনের গান আর দর্শন আজ বিশ্বের মানচিত্রকে স্পর্শ করেছে। তাঁর প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিদেশে বাউল ও লালন সম্পর্কে আগ্রহ ও অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায় চার্লস ক্যাপওয়েল, এডওয়ার্ড সি. ডিমক, জোসেফ কুকার্জ, জুনে ম্যাকড্যানিয়েল, ক্যারল সলোমন, ম্যান্ড্রিন উইনিয়স, ফাদার মারিনো রিগন, মাসাউকি ও’নিশি, জান ওপেনশ’, মাসাহিকি তোগাওয়া- এঁদের রচনায়। অদূর ভবিষ্যতে বহির্বিশ্বে লালন বাংলাদেশ ও বঙ্গ-সংস্কৃতির প্রতিনিধি-ব্যক্তিত্ব হিসেবে গৃহীত হবেন সে সম্ভাবনা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। লালনের মৃত্যুর পর পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ১২৬ বছর। তবু আজও লালন সমান প্রাসঙ্গিক, জনপ্রিয় ও আধুনিক। 

আজ আবার নতুন করে সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদের উত্থানের কালে- মনুষ্যত্ব-মানবতার লাঞ্ছনার সময়েÑ সন্ত্রাস-নৈরাজ্যের বৈরী যুগে লালনের গান হতে পারে প্রতিবাদের শিল্প- শান্তি ও শুভবুদ্ধির প্রতীক- মানুষের প্রতি হারানো বিশ্বাসকে ফিরিয়ে আনার পরম পাথেয়। 

লেখক- ডক্টর আবুল আহসান চৌধুরী। অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ।

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers