সাহিত্য
  >
প্রবন্ধ

বাংলা সাহিত্যের বিস্ময়কর প্রতিভা মধুসূদন

ফারুক হোসেন শিহাব জানুয়ারি ২৫, ২০১৮, ১৫:৪৬:৪৪

  • বাংলা সাহিত্যের বিস্ময়কর প্রতিভা মধুসূদন

‘সতত, হে নদ তুমি/ পড় মোর মনে/ সতত তোমার কথা/ ভাবি এ বিরলে’ নিজের জন্মভূমির জন্য কি অসাধারণ মমত্ব! সুদূর প্রবাসে বসে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত কপোতাক্ষ নদ নিয়ে এমনি লিখেছিলেন অমর কাব্যগাঁথা ‘কপোতাক্ষ নদ’। এমনি তাঁর অসংখ্য সৃজনসম্ভারে ভরে আছে বাংলার সাহিত্য ভাণ্ডার।

কবিতাটি যেমনি কালজয়ী হয়েছে তেমনি বাঙালির সাহিত্য ভাণ্ডারকে পুষ্পে-পল্লবে ভরিয়ে দিয়ে আজন্মের জন্য হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন বাংলার বহুমাত্রিক সাহিত্য স্রষ্টা মাইকেল মধুসূদন দত্ত। যুগ যুগ ধরে মানুষের অন্তর জুড়ে রয়েছেন তিনি। আজ ২৫ জানুয়ারি বাংলা সাহিত্যের এই দিকপালের ১৯৪তম জন্মবার্ষিকী। মহাকবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

১৮২৪ সালে যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন অমিত্রাক্ষর (সনেট) ছন্দের প্রবর্তক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। বাবা জমিদার রাজনারায়ণ দত্ত কলকাতার একজন প্রতিষ্ঠিত উকিল ছিলেন। মা জাহ্নবী দেবী ছিলেন সাধ্বী ও গুণশালিনী নারী। জমিদার ঘরে জন্মগ্রহণ করেও শুধুমাত্র সাহিত্যকে ভালোবেসে মধুসূদন সমাজ সংসার থেকে পেয়েছেন বঞ্চনা আর যন্ত্রণা।

মধুসূদনের বাল্যকাল অতিবাহিত হয় সাগরদাঁড়িতেই। প্রথমে তিনি সাগরদাঁড়ির পাঠশালায় পড়াশুনা করেন। পরে সাত বছর বয়সে কলকাতার খিদিরপুর স্কুলে ভর্তি হন। এরপর ১৮৩৩ সালে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজের অধ্যয়নরত অবস্থায় বাংলা, সংস্কৃত, ফারসি ভাষা শেখেন। ১৮৪৪ সালে তিনি বিশপস কলেজে ভর্তি হন। ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত ওই কলেজে অধ্যয়ন করেন। এখানে তিনি ইংরেজি ছাড়াও গ্রিক, ল্যাটিন ও সংস্কৃত ভাষা শেখার সুযোগ পান। এসময় ধর্মান্তরের কারণে মধুসূদন তার আত্মীয় স্বজনদের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তাঁর পিতা এসময় অর্থ পাঠানো বন্ধ করে দেন। তাই অগত্যা ১৮৪৮ সালে তিনি ভাগ্যান্বেষণে মাদ্রাজ গমন করেন।

১৮৪৮-৫২ সাল পর্যন্ত মাদ্রাজ মেইল অরফ্যান অ্যাসাইলাম স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন। এরপর ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। এসময় সাংবাদিক ও কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। একই সঙ্গে হিব্রু, ফরাসি, জার্মান, ইটালিয়ান, তামিল ও তেলেগু ভাষা শিক্ষাগ্রহণ করেন।

মাদ্রাজে অবস্থানকালে প্রথমে রেবেকা ও পরে হেনরিয়েটা’র সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর ১৮৬২ সালে ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে বিলেত গমন করেন এবং গ্রেজ ইন এ যোগদান করেন। ১৮৬৩ সালে প্যারিস হয়ে ভার্সাই নগরীতে যান। এরপর ১৮৬৫ সালে আবার ইংল্যান্ডে ফিরে যান। ১৮৬৬ সালে গ্রেজ ইন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন। ১৮৬৭ সালে দেশে ফিরে কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় যোগদান করেন। ১৮৭০ সালে হাইকোর্টে অনুবাদ বিভাগে যোগদান করেন। এখানে কিছুদিন কাজ করার পর পুনরায় আইন পেশায় যোগদান করেন।

বাংলা সাহিত্যে বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত সাহিত্য কর্মের মধ্যে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ১২টি গ্রন্থ এবং ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত ৫টি গ্রন্থ রয়েছে। Timothy PenPoem ছন্দনামে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ, The Captive ladie (১৮৪৮), দ্বিতীয় গ্রন্থ vissions of The past। পদ্মাবতী নাটক, তিলোত্তমা সম্ভব কাব্য, মেঘনাদ বধ মহাকাব্য, বীরাঙ্গনা (১৮৬২), কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১), ব্রজাঞ্জনা (১৮৬১), হেক্টের বধ (১৮৭১), মায়াকানন (১৮৭৩), বঙ্গভাষা’কপোতাক্ষ নদ’ ইত্যাদি সনেট। এই সনেটগুলো ১৮৬৬ সালে চতুর্দশপদী কবিতাবলি নামে প্রকাশিত হয়।

দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকটি তিনি ইংরেজি অনুবাদ করেন। Eurasion (পরে eastern Guardian), Madras Circulator and General Chronicle ও Hindu Chronicle এর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন ১৮৪৮-১৮৫৬ সাল পর্যন্ত। ১৮৬২ সালে তিনি হিন্দু প্যার্টিয়ট পত্রিকার সম্পাদনা করেন।

সাহিত্যে অমর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মহাকবির স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। মধুকবি তাঁর বিরল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন বাংলা সাহিত্যে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই। অসাধারণ প্রতিভাধর এই কবি তাঁর সৃষ্টিশীলতায় বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে করেছেন সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর।

মাইকেলের ব্যক্তিগত জীবন ছিল নাটকীয় এবং বেদনাঘন। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন মাত্র ৪৯ বছর বয়সে কলকাতায় কপর্দকশূন্য করুণ অবস্থায় মারা যান মহাকবি মাইকেল মধুসূদন। মৃত্যুর পর তাঁর ভাইয়ের মেয়ে কবি মানকুমারি বসু ১৮৯০ সালে সাগরদাঁড়িতে মহাকবির প্রথম স্মরণসভার আয়োজন করেন। সেই থেকে শুরু হয় মধু মেলার।

এর ধারাবাহিকতায় এবারও মধুসূদন দত্তের ১৯৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতা ও যশোর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে কবির জন্মভিটা সাগরদাঁড়িতে ২০ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সপ্তাহব্যাপী এই মধুমেলা শেষ হবে আগামীকাল ২৬ জানুয়ারি শুক্রবার। মেলার সমাপনী আসরে প্রদান করা হবে ‘মধুসূদন পদক’। মধুমেলা উপলক্ষে সাগরদাঁড়ি সেজেছে বর্ণিল সাজে। হাজারো মানুষের পদচারণয় এখন মুখরিত সাগরদাঁড়ি।

 

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2021 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers